[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

দুর্ঘটনায় বর–কনেসহ ১৪ জন নিহত, এক পরিবারের তিনজনের একসঙ্গে জানাজা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত নববধূ মার্জিয়া আক্তার মিতু, তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার ও দাদি রাশিদা বেগমের জানাজায় অংশ নেন এলাকাবাসী। শুক্রবার সকালে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকশা গ্রামে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন 

খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকশা গ্রামে শুক্রবার সকালে ঢুকতেই দেখা যায়, দলে দলে মানুষ একটি বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। রাস্তার দুই পাশে নারী-পুরুষের ভিড়। কারও চোখে জল, কারও মুখে গভীর স্তব্ধতা। সবাই যাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের বাড়িতে।

মাত্র দুই দিন আগেও এই বাড়িতে ছিল উৎসবের আমেজ। গত বুধবার রাতে ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তার মিতুর। বর বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শ্যালাবুনিয়া গ্রামের আহাদুর রহমান ওরফে সাব্বির। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বরপক্ষের সদস্যরা সেদিন রাতে কনের বাড়িতেই ছিলেন।

পরদিন বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নববধূকে নিয়ে মাইক্রোবাসে করে মোংলার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় বরপক্ষ। কিন্তু সেই যাত্রা আর গন্তব্যে পৌঁছায়নি। পথে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে নৌবাহিনীর একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসের আরোহী বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত হন।

শুক্রবার সকালে আবদুস সালাম মোড়লের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, চারপাশ মানুষে পরিপূর্ণ। কেউ কাঁদছেন, কেউ আবার নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন। নিহত কনে মার্জিয়ার মা মুন্নি খাতুন কাঁদতে কাঁদতে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। ঘরের বারান্দায় তাঁকে শুইয়ে দিয়ে কয়েকজন নারী পাশে বসে বিলাপ করছেন। বাড়ির উঠানে এখনো বিয়ের প্যান্ডেলের সেই বাঁশ দাঁড়িয়ে আছে।

ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মার্জিয়ার ফুফু মঞ্জুয়ারা বেগম চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘আমি নিজে মেয়েটার হাতে চুড়ি পরিয়ে দিয়েছিলাম। সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেছি। বিয়ের দিন কত আনন্দ ছিল! অথচ আজ সেই মেয়ের লাশ দেখতে হচ্ছে। শুধু মার্জিয়া নয়, ওর ছোট বোনটাও চলে গেল। দাদি-নানি দুজনও একসঙ্গে মারা গেছে।’

স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে ছিল আবদুস সালাম মোড়লের সংসার। স্থানীয় বাজারে মুরগি বিক্রি করে তিনি সংসার চালান। সালাম মোড়লের বোনের জামাই আক্তারুল ইসলাম বলেন, তিন ভাইবোনের মধ্যে এখন শুধু পাঁচ বছর বয়সী ছোট ছেলেটিই বেঁচে আছে। দুর্ঘটনায় মারা গেছেন মার্জিয়া আক্তার, তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম। নানির মরদেহ তাঁদের নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাকি তিনটি মরদেহ আনা হয়েছে নাকশা গ্রামে।

মার্জিয়া আক্তার নাকশা আলিম মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর ছোট বোন লামিয়া একই মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। প্রতিবেশী আরাফাত হোসেন বলেন, ‘বুধবার রাতেই ধুমধাম করে বিয়েটা হলো। রাত ১২টার দিকে বিয়ের কাজ শেষ হয়। আমরা সবাই একসঙ্গে দাওয়াত খেলাম। কে জানত, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটবে!’ তিনি আরও জানান, ভোর পাঁচটার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মরদেহগুলো গ্রামে এসে পৌঁছায়। এরপর থেকেই বাড়িতে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।

বাড়ির পেছনের পারিবারিক কবরস্থানে গিয়ে দেখা যায়, পাশাপাশি তিনটি কবর খোঁড়া হয়েছে। কবরস্থানের পাশে বিলের ধারে খাটিয়ায় সাদা কাপড়ে ঢাকা ছিল তিনটি মরদেহ। সেখানে কয়েকজনের কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বিলাপ করছিলেন বাবা আবদুস সালাম মোড়ল।

সকাল ১০টার দিকে মার্জিয়া আক্তার মিতু, তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার ও দাদি রাশিদা বেগমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে হাজারো মানুষ অংশ নেন।

জানাজায় অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল মোড়ল বলেন, ‘এই গ্রামে একই পরিবারের তিনজনের একসঙ্গে মৃত্যু আগে কখনও হয়নি। একসঙ্গে তিনজনের জানাজা ও দাফন বিরল ঘটনা। এমন মর্মান্তিক মৃত্যু যেন আর কোনো পরিবারে না আসে।’

আমাদী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা আগে দেখিনি। একসঙ্গে দুই মেয়ে, মা আর শাশুড়িকে হারিয়ে সালাম মোড়লের কান্না থামানো যাচ্ছে না। আমরাও তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা পাচ্ছি না।’

বাগেরহাটের কাটাখালী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাফর আহমেদ বলেন, মাইক্রোবাসটিতে চালকসহ ১৫ জন ছিলেন। দুর্ঘটনায় ১৪ জনই মারা গেছেন। একজন বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন