ইউনূস সরকারের দেড় বছর: প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার হিসাব-নিকাশ
![]() |
| মুহাম্মদ ইউনূস | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন |
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের কারণে দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সরকার প্রধান হিসেবে শপথ নেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সময় তিনি দেশে ছিলেন না। শপথের দিন দুপুরে তিনি ফ্রান্স থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছান।
ঢাকায় নেমেই তিনি বলেন, আমাদের কাজ হলো সবাইকে রক্ষা করা। প্রতিটি মানুষকে রক্ষা করা, প্রতিটি মানুষ আমাদের ভাই। একটা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে নিয়ে আসা। 'আমার ওপর আস্থা রেখে ছাত্ররা আমাকে আহ্বান করেছে, আমি সাড়া দিয়েছি। দেশবাসীর কাছে আমার আবেদন, আপনারা যদি আমার ওপর বিশ্বাস রাখেন, তাহলে নিশ্চিত করেন, দেশের কোনও জায়গায় কারও ওপর হামলা হবে না। এটা আমাদের প্রথম দায়িত্ব। ১২ ফেব্রুয়ারি একটা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠন করলো বিএনপি। কিন্তু গত ১৮ মাস কেমন ছিল বাংলাদেশ?
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ব্যাপক অবনতি হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যত ছিল অকার্যকর। তাদেরকে পুনরায় কাজে ফিরিয়ে আনতে সময়ে লেগেছিল ৪ মাস। এরপর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পেরিয়ে যায় আরও বেশ কয়েক মাস। ঢাকাসহ সারা দেশের মানুষের মধ্যে রাতের বেলা ডাকাত আতঙ্ক কাজ করছিল। এতে করে দেখা গেছে, রাতের বেলায় বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় নিজ উদ্যোগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করেছেন এলাকাবাসী। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির এই চিত্র পাল্টাতে সময় লেগেছে কয়েক মাস। একসঙ্গে সেনাবাহিনীকে নামতে হয়েছে মাঠে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জনতার সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে জনতার সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছিলেন অন্তত ১২৮ জন। অন্তর্বর্তী সরকারের এই সময়কালে কমপক্ষে ২৯৩ জন জনতার সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালে কারা হেফাজতে কমপক্ষে ১০৭ জন মারা গেছেন। ২০২৪ সালে দেশের কারাগারগুলোতে ৬৫ জনের মৃত্যু ঘটেছিল— যার মধ্যে হাজতি ৪২ এবং কয়েদি ছিলেন ২৩ জন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে বিভিন্ন সময় বিবৃতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। আসকের তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কমপক্ষে ৩৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সময়, ভিন্ন মত ও গণমাধ্যম স্বাধীন এবং সেখানে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না দাবি করা হলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে ভিন্ন কথা। আসকের প্রতিবেদন বলছে, এ সময়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকির মধ্যে পড়েছে। গণমাধ্যমের ওপর বাংলাদেশের ইতিহাসের জঘন্যতম হামলা হয়েছে ১৮ ডিসেম্বর। এ দিন রাতে একদল প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক দুটি পত্রিকার ভবনে নজিরবিহীনভাবে ভাঙচুর, লুটতরাজ ও আগুন-সন্ত্রাস চালায়। এই হামলার ফলে সেখানে কর্মরত সংবাদকর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন। ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও আইনি নিপীড়নের ঘটনা একটি উদ্বেগজনক ধারায় পৌঁছেছে বলে মনে করে আসক। আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে অন্তত ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির তথ্য পাওয়া গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যথেষ্ট স্থবির ছিল বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম, ডলার সংকট, বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ, পাচারের অর্থ ফেরত আনাসহ নানামুখী চ্যালেঞ্জ ছিল। মূল্যস্ফীতি কমলেও নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি, রিজার্ভ বাড়লেও ডলারের সংকট কাটেনি, বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে চাপ ছিল এবং পাচারের অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনও অর্থ ফিরিয়ে আনা যায়নি। ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট ছিল পুরোটা সময়। অপরদিকে বেড়েছে দারিদ্র্যের হার।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করার কারণে গত ১৮ মাসে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাননি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগ তেমন আসেনি। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয় অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের কারণে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষ আইনের অধীনে বাতিল হওয়া ৩৭টি প্রকল্প। ১৪টি দেশের অর্থায়নের এসব প্রকল্পের মধ্যে চীনের চারটি, সিঙ্গাপুরের সাতটি এবং ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে একটি করে প্রকল্প। এসব প্রকল্পে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করার কথা ছিল। এরই মধ্যে এসব প্রকল্পে ৩০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। এতে করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়।
সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আনায় প্রতিযোগী দেশগুলোর থেকে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদের জন্য সিঙ্গাপুর থেকে তরুণ ব্যাংকার আশিক চৌধুরীকে উড়িয়ে এনে চমক দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে অন্য ক্ষেত্রে চমক দেখালেও গত ১৬ মাসে বিদেশি বিনিয়োগ আনায় চমক দেখাতে পারেননি আশিক চৌধুরী।
এসময় নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের হারও নিম্নমুখী। আবার অনেক ছোট-মাঝারি ও বড় কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। বাংলাদেশ না পারলেও প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ পাচ্ছে ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া। এমনকি পাকিস্তানও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পাচ্ছে। যদিও দুই বছর আগেও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আনায় দেশটি বাংলাদেশের পেছনে ছিল। দেশে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে পরামর্শ দিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তারা সহযোগিতার আশ্বাস এবং সমর্থন জানালেও তেমন কোনো বিনিয়োগ ইউরোপ থেকে আসেনি। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা করা হলেও তা শেষ মুহূর্তে পিছিয়েছে। আর চট্টগ্রামে লালদিয়া টার্মিনাল তৈরির কাজ দেওয়া হয়েছে ডেনমার্কের একটি কোম্পানিকে।
তবে বিদায় বেলায় আশিক চৌধুরী বলে গেছেন, বন্দর র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না।
গত অক্টোবরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যবসা পরিবেশ সূচক প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশে উল্লেখ করার মতো কোনও উন্নতি হয়নি। উল্টো এক বছরে আইন-কানুনের তথ্য প্রাপ্তি, অবকাঠামো সুবিধা, শ্রম নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য সহজীকরণ, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ ও মান— এই ছয় সূচকে পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস পুরোটা সময় আলোচনায় ছিল সংস্কার কার্যক্রম। সংস্কার কাজের লক্ষ্যে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। এর মধ্যে প্রতিটি কমিশন বিভিন্ন সময়ে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন হলেও অনেক সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। উল্লেখযোগ্য সংস্কার কাজের মধ্যে আছে, বিচার বিভাগে সংস্কার, ৮০৮টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম পরিবর্তন, সরাসরি নিয়োগের আবেদন ফি ৭০০ টাকা থেকে ২০০ টাকায় নামিয়ে নিয়ে আসা, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের বয়সসীমা ৩২ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি, ধর্মীয় উৎসবে ছুটি বৃদ্ধি, ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন, পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়া পাসপোর্ট ইস্যু, পুলিশ কমিশন তৈরিতে আইন সংশোধন, গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যোগদান, শ্রম আইন সংস্কার ছাড়াও ১১৬টি অধ্যাদেশ জারি ও ১৪টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এছাড়া আর্থিক খাতে বিভিন্ন সংস্কারের কাজ করেছে এই সরকার। তবে গণমাধ্যম, নারী সংস্কার কমিশনের তেমন কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যায়নি।
এছাড়া স্বাস্থ্য এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুইটি বিভাগ এক করে মন্ত্রণালয় দুটি পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে ১৬৬টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে এগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম শুরু হয়। ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কমিশনের দীর্ঘ আলোচনা শেষে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়। এগুলো নিয়ে তৈরি করা হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ।
৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। অন্য প্রস্তাবগুলো সরকারি আদেশ, অধ্যাদেশ জারি বা আইন বিধি করে বাস্তবায়ন সম্ভব। বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের কিছু প্রস্তাব ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো অধ্যাদেশ বা কোনও আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। জুলাই জাতীয় সনদে থাকা সংবিধান-সম্পর্কিত এই ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়েই হয়েছে গণভোট। এসব প্রস্তাবের মধ্যে ১৯টি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব হিসেবে চিহ্নিত করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
মূলত সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে তিনটি স্তর। প্রথমত, আইনি ভিত্তি দিতে আদেশ জারি। গত ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। এরপর দ্বিতীয় স্তরে হয়েছে গণভোট। গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়ী হওয়ায় এখন তৃতীয় স্তর শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সরকারি দলের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয় তারা সংস্কার পরিষদের শপথ নেবে না।
অন্তর্বর্তী সরকার বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য ঢাকায় সম্মেলন আয়োজন করেছিল, তাতে বেশ কিছু বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলেও কার্যত কোনও বিনিয়োগ আসেনি। তবে বিদেশিদের কাছে কাজ হস্তান্তর করার ক্ষেত্রে মনোযোগ ছিল পুরোটা সময়। মতামত উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও শেষ মুহূর্তে পিছু হটে ডিপি ওয়ার্ল্ড। সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ধর্মঘট ডাকতে বাধ্য হন শ্রমিক-কর্মচারীরা। সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
গত ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রামের লালদিয়ার চরে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে ডেনিশ কোম্পানি এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। একই দিন পানগাঁওয়ের নৌ টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়ে চুক্তি হয় সুইজারল্যান্ডের কোম্পানি মেডলগের সঙ্গে।
শেষ সময়ে বিদেশিদের সঙ্গে বেশ কয়েকটা চুক্তি নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। এর মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি এবং চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি। চীনের সাথে ড্রোন কারখানা স্থাপনের চুক্তি, পাকিস্তান থেকে জেএফ-১৭ থান্ডার এবং চীন থেকে জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান ক্রয়, ইউরোপীয় কনসোর্টিয়াম থেকে ইউরোফাইটার টাইফুন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সাবমেরিন ক্রয়, তুরস্ক থেকে টি-১২৯ অ্যাটাক হেলিকপ্টার ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার সংগ্রহ এবং জাপানের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বেশ আলোচনা আছে সব মহলে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত এই সরকারের আমলে নেওয়া হয়। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বেশ কয়েকবার এয়ারবাস বিক্রির জন্য সরকারের কাছে প্রচারণা চালায়।
১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জানুয়ারি তড়িঘড়ি করে এক লাখ ছয় হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ের ৬৪টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৭৯ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকার ৪০টি প্রকল্পই সম্পূর্ণ নতুন। দেড় বছর মেয়াদে এই সরকার মোট ১৩৫টি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন এই চুক্তির অংশ হিসেবে বোয়িং থেকে নতুন ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। তবে আপাতত বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ চীন থেকে চারটি নতুন জাহাজ কেনার ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি সই করেছে। ঢাকার চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, চারটি জাহাজের মধ্যে দুটি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাংকার এবং দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার। এর মোট ব্যয় ২৪ কোটি ১৯ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার। এর মধ্যে দুটি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাংকারের জন্য ব্যয় হবে ১৫ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। আর দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার কেনায় ব্যয় হবে আট কোটি ৯৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। একই দিনে নৌ সদর দপ্তরে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একটি 'অব দ্য শেলফ' হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল কেনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
শেষ মুহূর্তে সরকারের এমন চুক্তি নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, বিষয়টি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ।
বিদায়ী বছর বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। ২০২৪ সালে এই অবস্থান ১৪তম ছিল। অর্থাৎ এক ধাপ সুচকে অবনমন হয়েছে। ১৮২টি দেশের মধ্যে ১০০ এর স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর ২৪। যা বৈশ্বিক গড় স্কোরের (৪২) চেয়ে অনেক নিচে। অবশ্য গত বছরের চেয়ে এবার বাংলাদেশের ১ পয়েন্ট উন্নতি হয়েছে। তবে সামগ্রিক র্যাংকিংয়ে পিছিয়েছে এক ধাপ। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স বা 'দুর্নীতির ধারণা সূচক-২০২৫' প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এ তথ্য তুলে ধরেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের দুর্নীতির অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। এর থেকে উত্তরণ করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। আগের রাজনৈতিক সরকারের মতো এই সরকারেরও ব্যর্থতা আছে, তবে এই প্রতিবন্ধকতার পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতা ও আমলাতন্ত্রের দলীয়করণের বিষয়টি আমরা দেখেছি।

Comments
Comments