লাগামহীন পথচলায় বারবার হোঁচট, এবার নতুন লক্ষ্য সংযম
| উন্নয়ন | প্রতীকী ছবি |
দেশের উন্নয়ন বাজেটের সাম্প্রতিক ইতিহাস যেন বড় লক্ষ্য ঘোষণা আর সীমিত বাস্তবায়নের এক পুরোনো গল্প। প্রতি অর্থবছরের শুরুতে বড় অঙ্কের বাজেট দিয়ে অগ্রগতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। মাঝপথে বাজেট সংশোধন করে বরাদ্দ কমানো হয়। আর বছর শেষে দেখা যায়, বরাদ্দের বড় একটি অংশই খরচ করা সম্ভব হয়নি।
গত কয়েক বছরে বিগত সরকারগুলোর নেওয়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ঘোষণা ছিল জাঁকজমকপূর্ণ, কিন্তু বাস্তবায়নের গতি ছিল অত্যন্ত ধীর। বড় লক্ষ্য আর ছোট অর্জনের এই ব্যবধানই এখন আলোচনার মূল বিষয়।
এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে এডিপির লক্ষ্যমাত্রা বড় পরিসরে কমিয়ে ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার সুপারিশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এবারের লক্ষ্য কেবল বড় অংকের হিসাব দেখানো নয়, বরং বাস্তবতার সঙ্গে মিল রাখা। সরকার গভীরভাবে পর্যালোচনায় দেখেছে যে, কেবল বড় লক্ষ্য ঠিক করলেই উন্নয়ন হয় না; বরং বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহারই উন্নয়নের আসল মাপকাঠি। এই শিক্ষা থেকেই আগামী পরিকল্পনায় সংযমের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান এই চিত্রই নিশ্চিত করে। ২০২১–২২ অর্থবছরে এডিপির বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, খরচ হয় ২ লাখ ৩ হাজার কোটি। ২০২২–২৩ অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়িয়ে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা করা হলেও খরচ কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ১ হাজার কোটিতে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের বিপরীতে খরচ হয় মাত্র ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় ২০২৪–২৫ অর্থবছরে; ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের বিপরীতে বছর শেষে খরচ হয় মাত্র ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের শুরুতে এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা পরে সংশোধন করে ২ লাখ কোটি টাকায় নামানো হয়। অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) খরচ হয়েছে ৫০ হাজার ৫৫৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা। বরাদ্দ ও খরচের এই বড় ব্যবধানের ধারাবাহিকতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য কম লক্ষ্যমাত্রার এই নতুন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সদ্য সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জানিয়েছেন, বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনা করেই আগামী এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এবার কাগুজে উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সচিব বলেন, অতীতে বড় বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতির সঙ্গে তার কোনো মিল ছিল না। অনেক প্রকল্প সময়মতো শেষ হয়নি এবং বরাদ্দের বড় অংশ পড়ে ছিল। সেই অভিজ্ঞতাই এবার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, উন্নয়ন বাজেটের আকার নির্ভর করা উচিত সরকারের দক্ষতা ও বাস্তবায়নের ক্ষমতার ওপর। অনেক সময় বরাদ্দ দেওয়া হলেও তার পুরোটা খরচ হয় না। খরচের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নতুন সরকারকে বাজেট তৈরির পুরোনো ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আগামী বাজেটে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা, ২০৩২ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য পূরণ, ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং আয় বৃদ্ধির স্পষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে।
Comments
Comments