পরিবহন খাতের টাকাকে চাঁদাবাজি বলতে নারাজ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম
![]() |
| সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। আজ বৃহস্পতিবার সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে | ছবি: সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে |
পরিবহন খাতে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামে তোলা টাকাকে চাঁদাবাজি বলে মনে করেন না সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। এই অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেছেন, এই টাকা তোলা হচ্ছে সমঝোতার ভিত্তিতে, জোর করে আদায় করা হচ্ছে না। তাই একে চাঁদা বলা যাচ্ছে না।
বৃহস্পতিবার সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী রবিউল আলম এসব কথা বলেন। নতুন সরকারে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল গণমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক আলাপ। বিকেলে নিজ দপ্তরে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে ওই তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ও রাজীব আহসান উপস্থিত ছিলেন।
পরিবহন খাতের টাকা তোলা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘সড়কে পরিবহনের যে টাকার কথা বলা হয়, তাকে আমি চাঁদাবাজি হিসেবে দেখি না। মালিক ও শ্রমিক সমিতিগুলো তাদের কল্যাণে এই অর্থ ব্যয় করে। এটি একটি অলিখিত নিয়মের মতো। আমি সেই টাকাকেই চাঁদা বলব, যা কেউ দিতে চায় না বা দিতে বাধ্য করা হয়। মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলে তা মালিকদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়। সেই অর্থ কতটুকু কাজে লাগে তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমেই এই কাজটা করে।’
রবিউল আলম আরও বলেন, ‘শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনসহ অনেক সংস্থা এই টাকা তোলার কাজটি সমঝোতার ভিত্তিতে করে। তবে সেখানে যারা প্রভাবশালী বা যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের শ্রমিক সংগঠনের একটি আধিপত্য থাকে। যেহেতু তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে এটি করছে, তাই আমাদের পক্ষে একে চাঁদা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।’
তবে সমঝোতার মাধ্যমে তোলা এই টাকার পরিমাণ অতিরিক্ত কি না, সরকার তা খতিয়ে দেখবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী রবিউল আলম।
সরকারের অগ্রাধিকার সম্পর্কে জানাতে গিয়ে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনাকে জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে কাজ শুরু করেছে। রেল বাড়ানো, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খাল খনন এবং সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা—এসব খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হবে।
ঢাকার প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল ও যানজটের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনার কথা জানিয়ে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব কি না, নাকি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এনে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সে বিষয়ে সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিলে দ্রুত পরিকল্পনা নেওয়া হবে।
রেল খাতের দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, অনেক জায়গায় রেললাইন নির্মাণ শেষ হলেও ইঞ্জিন ও বগির অভাবে ট্রেন চালু করা যায়নি। কোথাও ইঞ্জিন এসেছে কিন্তু বগি নেই—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী রেল খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। দেশের ভেতরেই ইঞ্জিন ও বগি তৈরি করা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে দরপত্র প্রক্রিয়ায় (টেন্ডার) সমন্বয় আনার মাধ্যমে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ রেল যোগাযোগ পুনরায় চালুর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি বলেন, মহাসড়কে বাজার বসা, নিয়ম না মেনে গাড়ি রাখা (পার্কিং) এবং ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে যানজট বাড়ছে। রাস্তার ওপর পার্কিংয়ের নামে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ইজারা দেওয়ার বিষয়ে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে তা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পদ্মা সেতুর টোল আদায়ে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, নিয়মিত টোল আদায় হচ্ছে এবং সেতুর কিস্তিও পরিশোধ করা হয়েছে। এই বিষয়ে কোনো টাকা বকেয়া নেই বলে তিনি দাবি করেন। সামনের ঈদে বাড়ি ফেরা যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে আগের সফল পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাড়তি কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
আসন্ন ঈদে ঘরমুখী যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে আগের সফল মডেল অনুসরণ করা হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, অতিরিক্ত কিছু পদক্ষেপ যুক্ত করার বিষয়ে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পোশাক কারখানায় (গার্মেন্ট) আগাম ছুটি দেওয়ার প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী। তবে এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত নির্মিত বাসের বিশেষ লেন (বিআরটি) প্রকল্প সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ রবিউল আলম বলেন, প্রকল্পটি জনবান্ধব হয়নি—এমন একটি প্রাথমিক ধারণা রয়েছে। তবে এতে বিপুল অর্থ ব্যয় ও ঋণের বিষয় জড়িত থাকায় এখনই কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। বিষয়টি বর্তমানে পর্যালোচনায় রয়েছে।
দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে শেখ রবিউল বলেন, যেখানে জনস্বার্থ জড়িত, সেখানে দলীয় স্বার্থের কোনো স্থান নেই। কোনো সংগঠন বা গোষ্ঠীকে প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া হবে না। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেই মন্ত্রণালয় চালানো হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব নুরুন্নাহার চৌধুরী, ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুক আহমেদ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মইনুল হাসানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Comments
Comments