যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার এত অস্থির ছিল কেন: আনু মুহাম্মদ
![]() |
| আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক শিক্ষক আনু মুহাম্মদ। জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে অন্তর্বর্তী সরকার এত অস্থির ছিল কেন—সেই প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার এই চুক্তিগুলো যেভাবে করল, তাতে বাংলাদেশকে একধরনের হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফেলা হলো। তারা চাইলেই বলতে পারত, নির্বাচিত সরকার আসছে, আপনারা তাদের সঙ্গেই কথা বলুন।’
অনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘বাজেটের সময় থেকেই তাদের মধ্যে এসব নিয়ে অতিমাত্রায় উৎসাহ দেখা গেছে।’
রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত ‘দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ‘বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ওয়াচ’।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকের সঙ্গে চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক এই শিক্ষক বলেন, ‘চুক্তিগুলো করার ব্যাপারে তাঁদের বিশেষ উৎসাহ দেখে মনে হয়েছে, তাঁরা উপদেষ্টা কিংবা বিশেষ সহকারী হলেও আসলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হয়ে লবিং বা তদ্বিরকারীর ভূমিকা পালন করেছেন।’
নতুন সরকারের প্রতি এই বাণিজ্য চুক্তিগুলো পুনরায় বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, এসব চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে বড় ধরনের সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রয়োজনে চুক্তিগুলো খতিয়ে দেখা জরুরি।
বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ—তারেক রহমানের এই স্লোগান যদি সত্যি হয় এবং তিনি যদি এটি গুরুত্বের সঙ্গে বোঝাতে চান, তাহলে প্রথম কাজ হলো এই চুক্তিগুলো থেকে দেশকে রক্ষার পথ তৈরি করা। পাশাপাশি যাঁরা এই চুক্তি করেছেন, তাঁদের জবাবদিহি ও বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তিকে দেশের স্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি এই চুক্তি করার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ এমন চুক্তি করেনি, আর যারা করেছে তাদের শর্ত বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ভালো।
চুক্তির শর্ত নিয়ে তিনি আরও বলেন, সরকার বলছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আনলে তৈরি পোশাক খাতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের মতে, এতে এত শর্ত আর অনিশ্চয়তা রয়েছে যে সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট নয়। উল্টো তুলার দাম বেশি পড়বে এবং রপ্তানির পরিমাণও ঠিক করা নেই।
অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘ইউনূসের আগ্রহের কারণ কী ছিল? তিনি তো গ্রামীণ নামের নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোর সুবিধা নিয়েছেন এবং কর মওকুফ করিয়েছেন। নাকি জাতিসংঘ মহাসচিব হওয়ার জন্য কোথাও এমন কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন?’
চুক্তি বাতিল বা পুনর্বিবেচনার দাবি
আলোচনা সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা এই বাণিজ্য চুক্তিকে ‘অসম ও ক্ষতিকর’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে করা এই চুক্তি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। চুক্তির কিছু বাধ্যবাধকতার কারণে বাংলাদেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমে গেছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কৃষি খাতে ভর্তুকি কমানোর শর্তে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশের শিল্পকে দাঁড় করাতে ভর্তুকি প্রয়োজন। তাই সংসদে আলোচনা ও জনগণের মতামতের ভিত্তিতে এই চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
অসম চুক্তির উদাহরণ
জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা এসব চুক্তির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, এসব চুক্তির ধারাগুলো একপাক্ষিক বা অসম চুক্তির উদাহরণ। এগুলো নতুন করে বিচার-বিশ্লেষণ করা জরুরি। তাঁর মতে, চুক্তিগুলো রাজনৈতিক ও আইনগতভাবেও বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেনের সঞ্চালনায় সভায় মূল বক্তব্য তুলে ধরেন বরকত উল্লাহ মারুফ। আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন গবেষক মাহা মির্জা।

Comments
Comments