রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিশ্বকাপজয়ী তারকা মেসুত ওজিল, করবেন ইফতারও
![]() |
| কক্সবাজার শহরের আরআরআরসি কার্যালয়ে পৌঁছালে মেসুত ওজিল ও তুরস্কের প্রেসিডেন্টপুত্র নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ানকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। আজ দুপুরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
জার্মানির বিশ্বকাপজয়ী সাবেক ফুটবল তারকা মেসুত ওজিল এখন কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরে। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্টের ছেলে নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ান।
রিয়াল মাদ্রিদ ও আর্সেনালের সাবেক এই ফুটবলার ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে শিরোপাজয়ী জার্মানি দলের সদস্য ছিলেন। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান তিনি। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ওজিল মোট ৬৪৫টি ম্যাচ খেলেছেন এবং ১১৪টি গোল করেছেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নেকমোদ্দিন এরদোয়ানের নেতৃত্বে ওজিলসহ একটি প্রতিনিধিদল উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পৌঁছান। প্রিয় ফুটবল তারকাকে কাছে পেয়ে রোহিঙ্গা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা দেয়। অনেকে তাঁর সঙ্গে ছবি (সেলফি) তুলেছেন। নিরাপত্তার কড়াকড়ির কারণে অনেককে দূর থেকেই ওজিলকে একনজর দেখতে হয়েছে। পুরো দিনই আশ্রয়শিবিরে তাঁদের ব্যস্ত সূচি রয়েছে। প্রতিনিধিদলটি রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বিষয়ে কথা বলবেন এবং শিশুদের কয়েকটি স্কুল ঘুরে দেখবেন। সন্ধ্যায় একটি রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে তাঁরা ইফতার করবেন।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা থেকে বিশেষ বিমানে করে প্রতিনিধিদলটি কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সেখানে তাঁদের স্বাগত জানান কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ও পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান।
তুর্কি সরকারের সহযোগী সংস্থা ‘টার্কিশ কো-অপারেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন এজেন্সির’ (টিকা) একটি প্রকল্পের আওতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ডা. মুর্তজা মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়নের কাজ চলছে। এই প্রকল্পে তুর্কি সরকার ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছে। এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের জন্যই বুধবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন বিলাল এরদোয়ান ও মেসুত ওজিল।
কক্সবাজার বিমানবন্দরে নামার পর প্রতিনিধিদলটি শহরের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ে যান। সেখানে অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান তাঁদের স্বাগত জানান। সেখানে প্রায় ৪০ মিনিটের বৈঠক শেষে তাঁরা সড়কপথে ৪০ কিলোমিটার দূরে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের উদ্দেশে রওনা হন।
বৈঠকে নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ানের কাছে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন আরআরআরসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তিনি জানান, উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি শিবিরে ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা থাকলেও গত ৮ বছরে একজনকে ও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য সেখানকার একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর দখলে থাকায় নতুন করে আরও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে তহবিলের অভাবে রোহিঙ্গাদের খাদ্যসহায়তা কমে যাচ্ছে এবং শিশুদের স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে রোহিঙ্গা শিশুরা রাস্তায় ঘুরে সময় কাটাচ্ছে এবং মেয়েরা পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার কতটা আন্তরিক, তা প্রতিনিধিদলকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আশ্রয়শিবিরের বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলগুলো পুনরায় চালু করতে তুরস্ক সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। নেকমোদ্দিন এরদোয়ান এসব শিক্ষাকেন্দ্র চালুর বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন।’
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান আরও জানান, উখিয়ার আশ্রয়শিবিরে তুরস্ক সরকারের অর্থায়নে বর্তমানে ৯টি স্কুল চালু রয়েছে। তবে আরও স্কুল প্রয়োজন। দাতা সংস্থাগুলোর অর্থসহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত কয়েক মাসে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে অন্তত দুই হাজার শিশুশিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফের সহায়তায় আরও দুই হাজারের বেশি শিক্ষাকেন্দ্র চালু আছে।
আশ্রয়শিবিরে বৈঠকের পর নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ান সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই তুরস্ক সরকার পাশে ছিল এবং এখনো আছে। আমার বাবা-মাও রোহিঙ্গাদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন। রোহিঙ্গারা যাতে তাঁদের জন্মভূমিতে ফিরে যেতে পারেন, সেজন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।’
রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গারা অনেক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। তুরস্ক সরকার সব সময় তাঁদের পাশে থাকবে।’
নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ান ও মেসুত ওজিল আজ একটি রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে ইফতার করবেন। এ বিষয়ে বালুখালী আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা কামাল আহমদ বলেন, মেসুত ওজিলের সঙ্গে ইফতার করা তাঁদের জন্য আনন্দের বিষয়। ইফতারের আয়োজনে রোহিঙ্গাদের পছন্দের খাবার ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি ও লেবুর শরবত রাখা হবে।
আরআরআরসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, তুরস্কে রমজানের প্রথম দিনের ইফতার অসহায় মানুষের সঙ্গে করার একটি রেওয়াজ রয়েছে। সেই ঐতিহ্য মেনেই বিলাল এরদোয়ান ও বিশ্বখ্যাত ফুটবলার মেসুত ওজিল রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে ইফতার করছেন। এতে রোহিঙ্গারাও অত্যন্ত খুশি।

Comments
Comments