খুলনায় দুই খুন, রাব্বির ঘাড়ে কোপ দিয়ে মাথায় গুলি
![]() |
| হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে পুলিশ। রোববার খুলনার আদালত এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
খুলনায় আদালতের প্রধান ফটকের সামনের সড়কে গুলিতে নিহত দুই যুবক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ পলাশের সক্রিয় সহযোগী ছিলেন। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে আরেক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ রনি চৌধুরী ওরফে ‘গ্রেনেড বাবুর’ সহযোগীরাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
আজ রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আদালতে হাজিরা দিতে আসা হাসিব হাওলাদার (৪১) ও ফজলে রাব্বি রাজন (৩৭) নামের ওই দুই ব্যক্তিকে গুলি করে এবং কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হাসিবের বাড়ি নগরের নতুনবাজার ওয়াপদা বেড়িবাঁধ রোডের (মিনারা গলি) এলাকায়। আর ফজলে রাব্বি রূপসা উপজেলার পূর্ব রূপসার বাগমারা আবদুর রব মোড় এলাকার বাসিন্দা। পুলিশ জানায়, তাদের দুজনের বিরুদ্ধে ছয়টি করে মামলা রয়েছে।
![]() |
| নিহত হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজন (ডানে) | ছবি: সংগৃহীত |
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোনাডাঙ্গা থানার একটি অস্ত্র মামলায় হাজিরা দিতে ফজলে রাব্বি ও হাসিব মহানগর দায়রা জজ আদালতে যান। হাজিরা দিয়ে প্রধান ফটক থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছয় থেকে সাতজনের একটি দল ফজলে রাব্বির ঘাড়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ দেয়। এক ব্যক্তি তাঁর মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করেন। একই সময়ে আরেক সন্ত্রাসী হাসিবকে লক্ষ্য করে গুলি চালান।
দুই যুবক মাটিতে লুটিয়ে পড়লে কয়েকজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। আশপাশের মানুষ তখন নিরাপদ স্থানে সরে যান। কিছুক্ষণ পর সন্ত্রাসীরা কয়েকটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে এবং তারপর বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ের দিকে সড়ক ধরে চলে যায়। হাসিব ঘটনাস্থলেই মারা যান। আর ফজলে রাব্বি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।
নিহত হাসিবের এক প্রতিবেশী জানান, হাসিব আগে মাছ কেনাবেচা করতেন। সাত-আট মাস ধরে তিনি বাড়িতে থাকতেন না। দুপুরে আদালতের সামনে গুলি খেয়ে মারা গেলে পরিচিত এক ইজিবাইক চালক তাঁর লাশ নতুন বাজারে নিয়ে আসেন। সেখান থেকে লাশ স্থানীয় মসজিদে নেওয়া হয়। পরে পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য লাশ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।
প্রত্যক্ষদর্শী একজন বলেন, ঘটনার সময় তিনি সার্কিট হাউসের মূল ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ শব্দ শুনে প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো টায়ার ফেটে গেছে। পরে দেখতে পান, দুজন রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে পড়ে আছেন। কয়েকজন লোক তখন দৌড়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ের দিকে চলে যান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আদালত চত্বরের সীমানাপ্রাচীরের গা ঘেঁষে একজন যুবক মাটিতে পড়ে আছেন। আরেক যুবক লম্বা ছুরি দিয়ে তাঁকে কোপাচ্ছেন। পিস্তল হাতে আরও কয়েকজন যুবক আশপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর পূর্ব পাশের সড়ক ধরে তারা দল বেঁধে চলে যান।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা শামীম হাসান জানান, প্রথমে রাজনের লাশ, পরে হাসিবের লাশ হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি ও কোপের আঘাত ছিল।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, চলতি বছরের ৩০ মার্চ সোনাডাঙ্গা থানা এলাকায় যৌথ বাহিনী অভিযান চালায়। এ সময় শীর্ষ সন্ত্রাসী শেখ পলাশসহ ১১ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ফজলে রাব্বি ছিলেন। উদ্ধার করা হয় পিস্তল, শটগান, কাটা বন্দুক, গুলি, কুড়াল, চাপাতিসহ দেশি অস্ত্র। ওই ঘটনায় অস্ত্র মামলায় ফজলে রাব্বিকে ৬ নম্বর, হাসিব হাওলাদারকে ১১ নম্বর আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। আজ তাঁরা আদালতে হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন।
পুলিশ জানায়, হাসিব হাওলাদারের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে সোনাডাঙ্গা থানায় এবং ২০১৮ সালে লবণচরা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা, ২০২৩ সালে সদর থানায় হত্যাচেষ্টা, ২০২৫ সালে সোনাডাঙ্গা থানায় অস্ত্র আইনে, সরকারি দায়িত্বপালনে বাধা ও আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইনে মামলা আছে। ফজলে রাব্বির বিরুদ্ধে রূপসা থানায় ২০১৬ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনে, ২০২৫ সালে সোনাডাঙ্গা থানায় অস্ত্র আইনে, আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) ও দুটি হত্যাসহ মোট ছয়টি মামলা রয়েছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি চৌধুরী ওরফে ‘গ্রেনেড বাবু’ গ্রুপের সঙ্গে পলাশ গ্রুপের দ্বন্দ্ব রয়েছে। কয়েক দিন আগে কারাগারের ভেতরও দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছিল। পুরনো দ্বন্দ্বের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করেছি। ঘটনাস্থল ঘিরে রাখা হয়েছে। সিআইডি, গোয়েন্দা সংস্থা ও পিবিআইয়ের টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। নিহত দুজন শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাশের দলের লোক। এই হত্যাকাণ্ডে অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। তদন্তের পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে।’


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন