পদ্মা ট্রিবিউন | বাংলা নিউজ পেপার
বাংলাদেশ রাজনীতি বিশ্ব বাণিজ্য মতামত খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন ভিডিও

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

‘আপামর ছাত্রজনতার’ নামে উপাচার্যকে হেনস্তা, জোর করে পদত্যাগপত্রে সই

মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।

প্রতিনিধি রাজশাহী
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হককে তাঁর কার্যালয়ে হেনস্থা করে এক দল লোক। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হককে তাঁর কার্যালয়ে হেনস্থা করে এক দল লোক। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হককে ঘেরাও কর্মসূচি দিয়ে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এ সময় ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল তাঁর কাছ থেকে একটি কাগজে জোর করে স্বাক্ষর নেয়। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।


পরে বিকেলে জাওয়াদুল হক রাজশাহী মেডিকেল কলেজের পেছনে তাঁর অতিথিশালার সামনে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কাগজটি কী, তা তাঁকে পড়তে দেওয়া হয়নি। লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়ে তিনি ওই কাগজে সই করেন। তাঁর ধারণা, কাগজটি ছিল পদত্যাগপত্র। যাঁরা জোর করে স্বাক্ষর নিয়েছেন, তাঁদের চিনতে পারেননি।


জাওয়াদুল হক অভিযোগ করেন, তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। পরে তাঁকেও কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়।


বেলা ১১টার দিকে ‘রাজশাহী আপামর ছাত্রজনতা’র ব্যানারে ‘উপাচার্য ঘেরাও কর্মসূচি’ নিয়ে একদল লোক সেখানে হাজির হন। তাঁরা স্লোগান দিতে দিতে ভবনের ভেতরে ঢোকেন। সেখানে নিচে তাঁরা বক্তব্য দেন।


প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজশাহী মহানগর কৃষক দলের সভাপতি শরফুজ্জামান শামীমের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে আসে। তাঁদের সঙ্গে রাজশাহী মহানগর বিএনপির ৬ নম্বর ওয়ার্ড ইউনিটের সভাপতি আল মোস্তাক শাহীন, মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কামাল, জিয়া মঞ্চের সভাপতি বুলবুল ও সাধারণ সম্পাদক লাল্টু ছিলেন।


এ বিষয়ে সন্ধ্যা সাতটার দিকে শরফুজ্জামান শামীম বলেন, তিনি মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন। তবে উপাচার্যের কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ সঠিক নয়। উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আগে কয়েকবার মানববন্ধন হয়েছে। উপাচার্যকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে অবহিত করাই তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল। তাঁদের সঙ্গে রাজপাড়া থানা বিএনপিসহ স্থানীয় সাধারণ মানুষ ছিলেন।


রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন বলেন, ‘ঘটনাটি বিকেলে শুনেছি। মব সৃষ্টি করে যেই বিশৃঙ্খলা করুক, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলের কোনো নেতা-কর্মী এ ঘটনায় জড়িত থাকলে সাংগঠনিকভাবেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

উপাচার্য জাওয়াদুল হক তাঁর গেস্ট হাউসের সামনে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। মঙ্গলবার বিকেলে। ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

অধ্যাপক জাওয়াদুল হক ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে যোগ দেন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘তারা খুব আগ্রাসীভাবে আমার কক্ষে ঢুকে পড়ে; বলে, “আপনি, আওয়ামী লীগের দোসর, আপনি রাজশাহীর মানুষকে কাজ দেন না, ঢাকার মানুষ কাজ করে। আপনি এই চেয়ারে থাকবেন না।” আমি একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তারা আরও বলে, “আপনি চেয়ার থেকে ওঠেন এবং আপনি এই মুহূর্তে বের হয়ে যান। আপনাকে এই চেয়ারে আর দেখতে চাই না।”’


উপাচার্য বলেন, ‘এরপর একজন সামনে একটি কাগজ এগিয়ে দেন। আমি বললাম, কী কাগজ? কাগজটা দেখার দরকার আছে। তারা বলল, “আপনার দেখার দরকার নাই, আপনি সই করেন।” ওই সময় আমার ব্যক্তিগত সহকারীও সেখানে ছিলেন। তিনি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।’


পরিস্থিতি দেখে ভয় পেয়েছিলেন জানিয়ে উপাচার্য বলেন, কাগজে সই না করলে তাঁকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি সই না করলে আমিও শারীরিকভাবে হামলার শিকার হতে পারি। আর তাদের সামনে দেওয়া কাগজটা ছাপানো একটি কাগজ ছিল। আমাকে পড়ারও সুযোগ দেয়নি। তবে আমার কাছে মনে হলো, এটা একটা পদত্যাগপত্রই ছিল। ওপরে পদত্যাগপত্র—এ রকম একটা শব্দ আমার কাছে মনে হয়েছে। আমাকে পুরোটা পড়তে দেয়নি।’

‘রাজশাহী আপামর ছাত্রজনতা’র ব্যানারে ‘উপাচার্য ঘেরাও কর্মসূচি’ দেওয়া হয়। ছবি : সংগৃহীত

সই করার পর ওই লোকজন কাগজটি নিয়ে তাঁকে কার্যালয় থেকে বের করে দেন বলে জানান উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘আমি সই করে দিলে তারা কাগজটা নিয়ে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে বের করে নিয়ে আসে। তারা বলে, “আপনি এখন চলে যাবেন, এখানে দাঁড়াবেন না।” এ সময় আমার মুঠোফোনও নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে সেটি ফেরত দেওয়া হয়।’


জাওয়াদুল হক জানান, কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, তাঁর অফিসের কম্পিউটারের সিপিইউ খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরা, ওয়াই-ফাই সংযোগ ও বিদ্যুতের সংযোগও নষ্ট করা হয়েছে। রেজিস্ট্রার, ডেপুটি রেজিস্ট্রার, সহকারী রেজিস্ট্রারসহ বিভিন্ন দপ্তরে তালা দেওয়া হয়েছে।


ঘটনার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবকে বিষয়টি জানিয়েছেন বলে জানান উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা চলছে। এসব বিষয়ে যদি দ্রুত একটা সমাধান তাঁরা না দেন, তাহলে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম—একাডেমিক বলেন, প্রশাসনিক বলেন, আমাদের যে প্রকল্পের কাজগুলো চলছে, সেগুলো কিন্তু স্থবির হয়ে পড়বে।’

উপাচার্য জাওয়াদুল হকের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তাঁদের সবাইকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না বলে জানান উপাচার্য। তবে সেখানে কৃষক দলের কেউ ছিলেন বলে জানান তিনি। এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করা একটি গোষ্ঠী এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে তাঁর ধারণা। উপাচার্য বলেন, ‘এটা অবশ্যই তদন্ত করে বের করতে হবে। যে দলটি আসছে, তাদের বিভিন্ন ছবি প্রকাশিত হয়েছে। এটা তো দেখলেই শনাক্ত করা যাবে।’


উপাচার্য বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং নিজে নিজে লোক নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ সত্য নয়। কার্যালয়ে ভাঙচুর, মালামাল নিয়ে যাওয়া ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হবে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বলেও জানান তিনি।


এ ঘটনায় উপাচার্যের পিএস ও সেকশন অফিসার (অর্থ) নাজমুল হোসাইন বলেন, ‘আমাকে তারা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে। আমার শার্টের বোতাম ছিঁড়ে দিয়েছে। আমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করিনি। আমাকে ও ভিসি স্যারকে জোর করে পদত্যাগ করিয়েছে তারা।’


খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছে বলে জানান নগরের রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, রাত পৌনে ৯টা পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Moderated — may take a moment.