জুলাইয়ের হত্যা মামলায় প্রশ্ন, ‘শহীদ’ এখন সৌদি আরবে, বাদী ভুয়া
পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কোনো কোনো মামলার বাদীরই হদিস পাওয়া যাচ্ছে না, আবার কোথাও খোদ ‘নিহত’ বা ‘আহত’ দাবি করা ব্যক্তিই জীবিত অবস্থায় বিদেশে অবস্থান করছেন।
জুলাই অভ্যুত্থান দমনে আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্তে চরম অসঙ্গতি ও গোলমালের তথ্য মিলেছে। পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কোনো কোনো মামলার বাদীরই হদিস পাওয়া যাচ্ছে না, আবার কোথাও খোদ ‘নিহত’ বা ‘আহত’ দাবি করা ব্যক্তিই জীবিত অবস্থায় বিদেশে অবস্থান করছেন।
পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেশ কিছু মামলায় নির্দিষ্ট তারিখে গুলিতে নিহত বা আহত হওয়ার দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ের তদন্তে ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যে সেই দাবির সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা সত্যতা মেলেনি। ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে কিংবা মূল ঘটনার সঙ্গে কোনো সংযোগ ছাড়াই এসব সংবেদনশীল মামলা দায়ের করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে ঢালাওভাবে দায়ের করা এসব মামলার কারণে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ ও ভিত্তিহীন মামলার দায় থেকে নির্দোষ ব্যক্তিদের অব্যাহতি দিতে এবং প্রকৃত ঘটনা আড়ালকারীদের চিহ্নিত করতে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্তে একের পর এক নজিরবিহীন অসঙ্গতির প্রমাণ পাচ্ছে পুলিশ। আদালতে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঘটনার সময় ঘটনাস্থল থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে কিংবা দেশের বাইরে অবস্থান করা ব্যক্তিদেরও এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে। মূলত ব্যক্তিগত বিরোধ, জমি-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থে নিরীহ মানুষকে ফাঁসাতে অভ্যুত্থানের ঘটনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের জের ধরে আন্দোলনটি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ভারতে চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সরকারের পতন ঘটে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী এই অভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন, তবে সরকারি গেজেটে নিহতের সংখ্যা সাড় আট শর মতো বলা হয়েছে।
ছাত্র-জনতার এই অভ্যুত্থানের পর গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানায় ৭০৭টি মামলা দায়ের করা হয়, যেখানে মোট আসামির সংখ্যা ৫ হাজার ৭৯ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৯টি মামলা হয়েছে যাত্রাবাড়ী থানায়। এ ছাড়া পল্টন, হাতিরঝিল, ভাটারা, রামপুরা ও উত্তরার বিভিন্ন থানায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা হয়।
বর্তমানে ১২৬টি মামলার তদন্ত চলছে, যার মূল আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা। তবে ইতোমধ্যে তদন্ত শেষ হওয়া ১৯টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মধ্যে তিনটি মামলাই সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা’ ও ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়েছে। বাকি ১৬টি মামলায় পাওয়া গেছে মারাত্মক তথ্যগত অসঙ্গতি, ভুল পরিচয়, ভুয়া কাগজপত্র এবং বর্ণনার সঙ্গে বাস্তবতার অমিল। গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢালাও মামলা ও অর্থ লেনদেনের যে অভিযোগ আগে থেকেই সংবাদমাধ্যমে আসছিল, পুলিশের এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে তা আরও স্পষ্ট হলো।
হত্যা ও গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বেশ কয়েকটি মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, সাবেক এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতাসহ সাবেক আইজিপির বিচার চলছে। ইতোমধ্যে একটি মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে পুলিশের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তাকেও। এ ছাড়া আন্দোলনে সহিংসতার অভিযোগে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ও দলটির কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই জুলাই অভ্যুত্থানের একটি হত্যা মামলার তদন্তে নেমে নজিরবিহীন জালিয়াতির তথ্য পেয়েছে পুলিশ। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর হাতিরঝিলের উলন সড়ক এলাকায় আন্দোলনের সময় গুলিতে ৪৬ বছর বয়সী মো. বাবু নিহত হয়েছেন—এমন অভিযোগে আদালতে একটি মামলা হয়েছিল। হাতিরঝিল থানা-পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, ‘নিহত’ দাবি করা ওই ব্যক্তি আসলে জীবিত এবং বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত রয়েছেন।
মামলার এজাহারে ‘নিহত’ বাবুর খালাতো ভাই হিসেবে ইসমাঈল নামের এক ব্যক্তির স্বাক্ষর রয়েছে। এই মামলায় শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়।
আদালতে জমা দেওয়া মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, এজাহারে দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা ধরে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার বরুরকান্দি গ্রামে অনুসন্ধান চালায় পুলিশ। সেখানে জানা যায়, বাবু নামে কেউ মারা যাননি। তাঁর প্রকৃত নাম মো. শাকিল এবং তিনি জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবে আছেন।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সৌদি আরব থেকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান শাকিল। তিনি বলেন, আমি তো মারা যাইনি ভাই। আমি মরলে সৌদি আরব আসলাম কীভাবে? এ বিষয়ে পুলিশ আগেই আমার সঙ্গে কথা বলেছে। এখন আমি সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছি।
হাতিরঝিল থানার এই হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে কেবল নিহতের জীবিত থাকার তথ্যই নয়, বাদীর পরিচয় নিয়েও চরম অসঙ্গতি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এজাহারে দেওয়া মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে মিলন নামের এক ব্যক্তি ফোন ধরে জানান, তিনি ইসমাঈল নন। পরে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ধরে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রামপুর এলাকায় প্রকৃত ইসমাঈলের খোঁজ পায় পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তার কাছে ইসমাঈল দাবি করেন, তিনি এ ধরনের কোনো মামলা করেননি। পরে আদালতে উপস্থিত হয়েও তিনি একই জবানবন্দি দেন এবং জানান, তাঁর নাম-পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কেউ এই মামলা করেছে। সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকেও এজাহারের ওই নম্বরে যোগাযোগ করা হলে এক নারী ফোন ধরে বলেন, ইসমাঈল নামে কাউকে চিনি না। আপনি ভুল নম্বরে ফোন করেছেন।
হাতিরঝিল থানার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) রাসেল ইসলামের দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এজাহারে ‘বাবু’ নামের যে ব্যক্তির মৃত্যুর অভিযোগ করা হয়েছে, বাস্তবে তাঁর কোনো অস্তিত্ব বা মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থল, সাক্ষ্য-প্রমাণ, চিকিৎসকের মতামত, জুলাই শহীদদের সরকারি তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে ওই নামে কেউ নিহত হওয়ার তথ্য মেলেনি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মামলার সঙ্গে সংযুক্ত মৃত্যুসনদটি পরীক্ষা করে সেটি সম্পূর্ণ জাল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রকৃত ভুক্তভোগী কিংবা প্রকৃত বাদীর কোনো অস্তিত্বই তদন্তে পাওয়া যায়নি। এসব কারণে তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটিকে ‘মিথ্যা’ হিসেবে গণ্য করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন এবং এজাহারনামীয় আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করেছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাসেল ইসলাম বলেন, তদন্তে মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। মামলায় উল্লেখ করা নিহত ব্যক্তি ও বাদী—দুজনের দাবিরই সত্যতা পাওয়া যায়নি। তদন্তে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে একটি চক্র অসৎ উদ্দেশ্যে মামলাটি করেছে।
মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন বর্তমানে আদালতের বিবেচনাধীন রয়েছে। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত আগামী ৩ আগস্ট এ বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য করেছেন। তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী লুৎফর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
হাতিঝিলের মামলার মতো রাজধানীর পল্টন থানার আরও একটি হত্যা মামলার তদন্তে নজিরবিহীন জালিয়াতির তথ্য পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় পারভেজ আলী (২৪) নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন—এমন অভিযোগ এনে ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর মামলাটি করেছিলেন ইয়াসিন আরাফাত। তবে পিবিআইয়ের তদন্তে দেখা গেছে, ‘নিহত’ পারভেজ আলী নামের কোনো ব্যক্তির বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই।
মামলার এজাহারে বাদী ইয়াসিন আরাফাত দাবি করেছিলেন, ঘটনার দিন তিনি নিজেও গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, ঘটনাস্থলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও যুবলীগের তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ সরাসরি অস্ত্র হাতে গুলি চালান। এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাপস, পরশসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এবং পুলিশের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়।
মামলাটির তদন্ত শেষে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পিবিআই। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কথিত নিহত পারভেজ আলীর কোনো অস্তিত্ব যেমন পাওয়া যায়নি, তেমনি বাদী ইয়াসিন আরাফাত নিজে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন বলে যে দাবি করেছেন, তাও সম্পূর্ণ অসত্য। পুরো ঘটনাটিকে ভিত্তিহীন ও বানোয়াট উল্লেখ করে পিবিআই মামলাটিকে ‘মিথ্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করেছে।
এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে মামলার বাদী হওয়ার বিষয়টিই অস্বীকার করেন ইয়াসিন আরাফাত। পরে তিনি বলেন, আমি একটু ব্যস্ত আছি, আপনার সঙ্গে এই বিষয়ে পরে কথা হবে। এরপর থেকে তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর বাবা বিল্লাল হোসেন গাজীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাদীর গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চাঁদনীমুখা এলাকায়। সেখানে ইয়াসিন আরাফাত ও তাঁর বাবা স্থানীয়দের কাছে পরিচিত মুখ। মূলত একটি চক্র নিজেদের ফায়দা লুটতে অবাস্তব ও ভুয়া তথ্য দিয়ে এই ঢালাও মামলাটি দায়ের করেছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পল্টনের ভুয়া হত্যা মামলার বাদী ইয়াসিন আরাফাতের রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে তাঁর নিজ এলাকা সাতক্ষীরার গাবুরায়। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, একসময় তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দলটির বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতেন। পরে ঢাকা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হয়ে প্রথমে ছাত্রলীগ এবং পরবর্তীতে ছাত্র অধিকার পরিষদের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা দেখা যায়। এমনকি এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতার সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি টেলিভিশনে মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত আছেন।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকায় ইয়াসিন আরাফাত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন—এমন কোনো তথ্য স্থানীয় বাসিন্দা বা তাঁর পরিচিতদের কেউ দিতে পারেননি। গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জি এম মাছুদুল আলম বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। এগুলো সব ভুয়া। তদন্তে পুলিশ এসেছিল, তারাও কোনো প্রমাণ পায়নি।” বাদীর বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ছেলেটা চতুর, চালু আছে। ওর কোনো কিছুই বিশ্বাসযোগ্য নয়। শুনেছি, এখন ঢাকায় সাংবাদিকতা করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মাসুদ রানা জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, কোনো একসময় পায়ে আঁচড় লেগে বা পড়ে গিয়ে যে কাটা-ছেঁড়ার দাগ হয়েছিল, সেটিকেই গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্ন হিসেবে দেখিয়ে এই মিথ্যা মামলাটি করেছিলেন আরাফাত।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আরাফাতের দাবি অনুযায়ী তাঁর পায়ে গুলি লেগেছিল, অথচ বিষয়টি তাঁর নিজের বাবাও জানতেন না। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবির পক্ষে ইয়াসিন আরাফাত কোনো মেডিকেল সনদও পুলিশকে দেখাতে পারেননি।
পল্টন থানার ওই ভুয়া হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে পাবনার ট্রাকচালক চাচা-ভাতিজা আব্দুল মতিন ও নাজমুল হাসানকে। তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ তাঁদের গ্রামের বাড়িতে গেলে প্রথমবারের মতো তাঁরা এ মামলার বিষয়ে জানতে পারেন। সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি মামলায় ঢাকার ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার অভিযোগে আসামি হওয়ার কথা শুনে তাঁরা চরম বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
আব্দুল মতিন জানান, জুলাই আন্দোলনের সময় দেশের অস্থির পরিস্থিতির কারণে পরিবহন চলাচল কার্যত বন্ধ থাকায় তাঁরা ঘরেই বসে ছিলেন। ঘটনার দিন রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে তাঁদের থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তিনি বলেন, আমার বাপের জন্মেও এই বাদী বা যে মারা গেছে বলে বলা হচ্ছে, তাদের নাম শুনিনি ভাই।
ঢাকার একটি ঘটনায় সাতক্ষীরার বাদীর মামলায় পাবনার এই দুই বাসিন্দা কীভাবে আসামি হলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুল মতিন বলেন, পাশের বাড়ির কাশেম মুন্সির সঙ্গে আমাদের জমিজমা নিয়ে বিরোধ আছে। তার ভাতিজা রনি ঢাকায় ক্যামেরাম্যানের চাকরি করে। শুনেছি, মামলার বাদী ইয়াসিন আরাফাত আর রনি দুজন বন্ধু। জমিজমার বিরোধের জেরে আমাদের হয়রানি করতেই তারা মিলে এই মামলায় আমাদের আসামি করেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে রনির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
আসামিদের নির্দোষ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মাসুদ রানা বলেন, আসামিদের ওই দিনের মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) ও অবস্থান পর্যালোচনা করে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে ঘটনার সময় তাঁরা কেউই ঘটনাস্থলে ছিলেন না। মূলত ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে নিরীহ এই পরিবহন শ্রমিকদের মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
হাতিরঝিল ও পল্টন থানার মতো রাজধানীর আদাবর থানায় দায়ের হওয়া আরও একটি হত্যা মামলার তদন্তে নজিরবিহীন জালিয়াতি ও অসঙ্গতির প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। গত বছরের ৩০ নভেম্বর আদালতে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই মামলাটিকেও সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা’ ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পূর্বের দুটি মামলার মতো এই মামলার অভিযোগের ধরন, আসামির তালিকা এবং এজাহারের ভাষার ক্ষেত্রেও হুবহু মিল পাওয়া গেছে।
এজাহারে দাবি করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আদাবর থানা এলাকায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হামলায় আলী মিয়া নামের এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এ ঘটনায় মো. তোহা খান বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছিলেন। তবে তদন্তে নেমে পুলিশ ঘটনার কোনো সত্যতা পায়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলায় বাদীর যে মুঠোফোন নম্বরটি দেওয়া হয়েছে, সেটি সঠিক নয়। এমনকি নিহত দাবি করা আলী মিয়ার নাম, পরিচয় ও ঠিকানাও অসম্পূর্ণ এবং এতে ব্যাপক অসঙ্গতি রয়েছে। তদন্তে খোদ বাদীরই কোনো বাস্তব অস্তিত্ব বা খোঁজ মেলেনি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদাবর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তরুণ কুমার বলেন, তদন্ত শেষে আমরা ঘটনা সত্য নয় বলে নিশ্চিত হয়েছি এবং আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছি।
এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে বাদী তোহা খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এজাহারে দেওয়া নম্বরটি সচল পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া এজাহারে উল্লিখিত আদাবরের ঠিকানায় গিয়েও তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ওই বাড়ির বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তোহা নামে সেখানে কেউ থাকে না। উল্টো তোহার খোঁজ নেওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চান তাঁরা। মূলত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে একটি চক্র অসৎ উদ্দেশ্যে এই ভুয়া ও সাজানো মামলাটি দায়ের করেছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সাধারণভাবে মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়েরের ঘটনায় বাদীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নজির দেশে খুব বেশি নেই। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় হত্যা বা হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়ের হওয়া যেসব মামলা তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, সেসব মামলার বাদীদের বিরুদ্ধেও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য মেলেনি। তাঁরা আদৌ আইনের আওতায় আসবেন কি না, তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, যদি প্রমাণিত হয় যে মামলা ভুয়া, তাহলে দণ্ডবিধির ২১১ ধারার অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে নিরপরাধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। সে ক্ষেত্রে মিথ্যা মামলা দায়েরকারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুব বেশি না হলেও একেবারে যে নেই, তা নয়। জুলাইয়ের মামলাগুলোর শুরুতেই আমরা আশঙ্কা করেছিলাম এমনটি ঘটবে। এখন তদন্তে ঠিক সেটাই সামনে আসছে।
মিথ্যা মামলার কারণে প্রকৃত মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়বে কি না—এমন প্রশ্নে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া জানান, ফৌজদারি আইনে প্রতিটি মামলা স্বতন্ত্র। অন্য মামলায় কী হয়েছে, সেটি কোনো নির্দিষ্ট মামলার বিচার নির্ধারণ করে না। তবে একই ধরনের একাধিক মিথ্যা মামলা সামনে এলে বিচারকদের মানসিকতায় একটি সামগ্রিক প্রভাব তৈরি হতে পারে। তখন সব অভিযোগই হয়তো সত্য নয়—এমন একটি ধারণা জন্মানোর আশঙ্কা থাকে।
ভুয়া মামলার বাদীদের বিরুদ্ধে পুলিশের কোনো উদ্যোগ আছে কি না, জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, মামলার ভুয়া বাদীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই ক্ষেত্রেও সেটাই হবে। তবে জুলাইকে কেন্দ্র করে হওয়া ভুয়া হত্যা মামলাগুলো নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সরকার যদি বিশেষ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি ভিন্ন বিষয়।
How did this article make you feel?
Related Articles
যেসব অপরাধে দণ্ডিত হলেন ইনু
Jun 30, 2026
3 shared tags
ঝুঁকি নিয়েই ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন শেখ হাসিনা, শীর্ষ নেতাদের নিয়ে করবেন আত্মসমর্পণ
Jul 10, 2026
2 shared tags
এক মাস পর জুলাইযোদ্ধা সার্টিফিকেট দেব, পার পিস ৫০ টাকা
Jul 02, 2026
2 shared tags
শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে আদালতের নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ
Jul 11, 2026
1 shared tag