[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

বই, পুতুল ও বায়োস্কোপে শিশুপ্রহরে মুগ্ধতা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
আগ্রহ নিয়ে বই দেখছে শিশুটি। আজ শুক্রবার সকালে বইমেলায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন 

অমর একুশে বইমেলায় ছিল পঞ্চম শিশুপ্রহর। সকাল গড়াতেই মেলায় ভিড় করতে শুরু করে নানা বয়সী শিশু। কেউ এসেছে মা-বাবার হাত ধরে, কেউ দাদার সঙ্গে, আবার কেউ পরিবারের বড়দের সঙ্গে।

বেলা ১১টায় মেলার প্রবেশপথ খুলে দেওয়া হয়। শিশুপ্রহর চলে বেলা ১টা পর্যন্ত। এরপর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত বইপ্রেমীরা মেলায় প্রবেশ করতে পারেন।

মেলার ভেতরে ঢুকে শিশুরা যেন এক নতুন জগতের দেখা পায়। সারি সারি বইয়ের দোকান, রঙিন প্রচ্ছদ, গল্প আর কল্পনার ভাণ্ডার—সবকিছুই ছোটদের মনকে বিস্ময়ে ভরিয়ে দেয়। কেউ খুঁজছে রূপকথা, কেউ ছড়ার বই, আবার কেউ আগ্রহ নিয়ে দেখছে বিজ্ঞানভিত্তিক ছোটদের বই।

অনেক শিশুর এটাই প্রথম বইমেলায় আসা। তাই বইয়ের স্তূপ দেখে তাদের চোখেমুখে ছিল আনন্দ আর কৌতুহল। তবে শিশুপ্রহরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পুতুলনাচ।

উত্তরা থেকে বইমেলায় এসেছে ছোট্ট পাঠক ফারিহা কবির। তাকে নিয়ে এসেছেন মা সুরাইয়া আক্তার। পেশায় শিক্ষক সুরাইয়া আক্তার জানান, ছোটবেলা থেকেই মেয়েকে বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা থেকেই তাকে মেলায় নিয়ে আসা। গত বছরও তাঁরা এসেছিলেন।

ঘুরে ঘুরে মেয়ের পছন্দের কয়েকটি গল্প, ছড়া আর ভূতের গল্পের বইও কিনে দিয়েছেন সুরাইয়া আক্তার। তিনি মনে করেন, বইয়ের সঙ্গেই শিশুর কল্পনার জগৎ সবচেয়ে সুন্দরভাবে গড়ে ওঠে।

মেলায় এসে আনন্দে মেতেছে ফারিহা। সে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। হাসিমুখে সে জানায়, মেলায় এসে তার খুব ভালো লাগছে। বিশেষ করে ছড়া আর গল্পের বই তার খুব পছন্দ। তাই নিজের পছন্দের কয়েকটি বইও কিনেছে সে।

বেলা ১১টায় ‘কাকতাড়ুয়া পুতুল থিয়েটারে’র মঞ্চে শুরু হয় বিশেষ আয়োজন। ছোট ছোট রঙিন পুতুল—কখনো পাখি, কখনো বনের পশু—আর তাদের মজার গল্পে মুহূর্তেই জমে ওঠে মঞ্চের চারপাশ।

শিশুরা গোল হয়ে বসে মন দিয়ে পুতুলনাচ দেখতে থাকে। গল্পের মাধ্যমে সততা, বন্ধুত্ব আর পরিবেশ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরা হয়। কখনো তারা হাসিতে ফেটে পড়ে, আবার কখনো গল্পের চরিত্রদের সঙ্গে কথা বলার মতো করে চিৎকার করে ওঠে।

পুতুলের এই অভিনব গল্প বলা যেন শিশুদের কল্পনার দুয়ার খুলে দেয়। আয়োজনে পুতুলের চরিত্রগুলোও ছিল বেশ আকর্ষণীয়—ঐশ্বর্য, ঐতিহ্য ইতু, বাঘ মামা, মায়া হরিণ, কচ্ছপ, ছাগল, কাক আর খরগোশ। তাদের নিয়েই সাজানো হয়েছিল একের পর এক গল্প।

পুতুলনাচ অনুষ্ঠানে তিনটি গল্প দেখানো হয়—‘বনভ্রমণ’, ‘অপু দীপুর গল্প’ এবং ‘বল্টু মামা ও তার সঙ্গীরা’। শিশুদের সামনে গল্পগুলো তুলে ধরে পাপেট আলো ও ব্লু।

গল্প পড়ে শোনান গল্প পাঠক কাজী শামস তাথৈ ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির প্রশিক্ষক মোনামী ইসলাম কনক। তাঁদের প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় গল্পগুলো যেন শিশুদের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

মোহাম্মদপুর থেকে মা-বাবার সঙ্গে এসেছে দুই বোন নিপা ও দিপা। তাদের বাবা জিয়াউল হক পেশায় একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। তিনি জানান, টেলিভিশনে পুতুলনাচের কথা শুনে দুই মেয়েই খুব আগ্রহী হয়ে ওঠে। এরপর থেকেই মেলায় এসে পুতুলনাচ দেখার জন্য বায়না করছিল তারা।

পুতুলনাচ দেখে দারুণ খুশি নিপা। সে বলে, পুতুল অপু ও দিপুর গল্প তার খুব ভালো লেগেছে। তারা গাছ লাগায়, একসঙ্গে খেলাধুলা করে ও মজার মজার কথা বলে—যা দেখে সে খুব আনন্দ পেয়েছে।

মেলায় এসে নিপা ও দিপাও বেশ কয়েকটি বই কিনেছে। তাদের সংগ্রহে রয়েছে গল্পের বই, রূপকথা আর রহস্য-রোমাঞ্চের ছোঁয়া থাকা ভূতের গল্পের বই। ছোটদের এই উচ্ছ্বাস যেন বইমেলার পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

শিশুপ্রহরের এই আয়োজন শুধু বিনোদনের জন্য নয়, এর মধ্যে রয়েছে শেখার আনন্দও। অভিভাবকদের মতে, বইয়ের প্রতি ভালোবাসা গড়ে তোলার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো শৈশব। তাই গল্প, পুতুল আর আনন্দের মাধ্যমে শিশুদের বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ তাদের কল্পনার জগৎকে আরও সমৃদ্ধ করছে।

‘কাকতাড়ুয়া পুতুল থিয়েটারে’র প্রতিষ্ঠাতা আসাদুজ্জামান আশিক বলেন, তাঁরা গল্পের ছলে শিশুদের প্রাণ ও প্রকৃতির যত্ন নেওয়ার কথা বলছেন। কীভাবে গাছ লাগাতে হয়, গাছের যত্ন নিতে হয় এবং প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহার থেকে দূরে থাকতে হয়—সেই শিক্ষাই দেওয়া হচ্ছে গল্পগুলোতে। প্রতিটি গল্পেই পারস্পরিক বন্ধুত্ব এবং বই পড়ার প্রতি শিশুদের উৎসাহিত করা হয়।

পুতুলনাচ মঞ্চের পাশে বসানো হয়েছিল দুটি বায়োস্কোপ। হঠাৎ সেখান থেকে ভেসে আসে ডাক—‘এই বায়োস্কোপ, বায়োস্কোপ!’ সেই ডাক শুনে কৌতুহলী শিশুরা এগিয়ে যায় রঙিন এক বাক্সের সামনে।

ডাক দিচ্ছিলেন দয়াল চন্দ্র। তিনি এই দলেরই একজন সদস্য। তাঁর বায়োস্কোপের ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে এক ছোট্ট গল্পের জগৎ। বাক্সের গোল কাচে চোখ রেখে একে একে দেখতে শুরু করে শিশুরা। সেখানে চলছিল ‘কুঁজো বুড়ির গল্প’। মা-বাবার সঙ্গে আসা জাহিয়া চৌধুরী রাহা ও তাইয়েবা আগ্রহ নিয়ে সেই গল্প দেখছিল।

বায়োস্কোপ দেখে মুগ্ধ হয় ছোট্ট জাহিয়া চৌধুরী রাহা। তার চোখে ছিল বিস্ময়ের ঝিলিক। ছোট্ট একটি বাক্সের ভেতর এত সুন্দর গল্প দেখা যায়—এটাই তাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে। রাহা বলছিল, বায়োস্কোপের ভেতর সে এক দাদু আর শিয়াল দেখেছে।

কখনো হাসি, কখনো কৌতুহল—সব মিলিয়ে রাহার কাছে অভিজ্ঞতাটা ছিল একদম নতুন। বইমেলার ভিড়ের মধ্যেও বায়োস্কোপের ছোট্ট জানালাটি তার কাছে হয়ে উঠেছিল অন্য রকম আনন্দের উৎস।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন