[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

‘তেল নেই’ নোটিশ, কিছু পাম্পে সীমিত

প্রকাশঃ
অ+ অ-
খুলনার বেশির ভাগ পাম্পে ‘তেল নাই’ লেখা সাটানো রয়েছে। এরপরও অনেকে তেল নিতে পাম্পের সামনে ভিড় করছেন। শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নগরের পাওয়ার হাউজ মোড় এলাকার কেসিসি পেট্রোল পাম্পের সামনে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় খুলনা ও সিলেটের বিভিন্ন তেল বিক্রয়কেন্দ্রে (ফিলিং স্টেশন) ভিড় করছেন যানবাহনচালকেরা। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। দেশের অন্যান্য এলাকা থেকেও একই ধরনের খবর পাওয়া গেছে।

খুলনার বিভিন্ন পাম্পে ‘তেল নেই’ লিখে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। দু-একটি পাম্পে সামান্য পরিমাণে পেট্রল পাওয়া গেলেও অন্য কোনো জ্বালানি মিলছে না। অন্যদিকে, সিলেটের বিভিন্ন স্টেশনে তেল বিক্রির পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে মোটরসাইকেলের জন্য ২০০ টাকা এবং অন্যান্য গাড়ির জন্য ৫০০ টাকার তেল বরাদ্দ করা হচ্ছে। তবে কিছু স্টেশনে চাহিদা অনুযায়ী তেল বিক্রি হতেও দেখা গেছে। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত দুই শহরের বিভিন্ন পাম্প ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

খুলনা
শনিবার সকালে নগরের বিভিন্ন এলাকার পাম্প ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তেলের জন্য পাম্পের সামনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। তেল না পেয়ে অনেক চালক ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। বেশ কয়েকটি পাম্পে ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। অনেক পাম্পে কোনো কর্মীকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুক্র ও শনিবার জ্বালানি সরবরাহকারী কেন্দ্র (ডিপো) বন্ধ থাকে। ডিপো থেকে আগে যে পরিমাণ তেল আনা হয়েছিল, তার প্রায় সবই শুক্রবার বিকেলের মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। মজুত না থাকায় বিক্রি বন্ধ রাখতে হয়েছে।

সকাল ১০টার দিকে নগরের নতুন রাস্তা এলাকার মেসার্স এলেনা পেট্রোলিয়াম সাপ্লাই পাম্পে গিয়ে দেখা যায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি। সেখানে ডিজেল ও অকটেন শেষ হয়ে গেছে; পেট্রল দেওয়া হচ্ছে সীমিত পরিমাণে। তেল নিতে আসা মো. শাহেদ বলেন, ‘খুলনা শহরের অধিকাংশ পাম্পে ২০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না। বাধ্য হয়ে এখানে এলাম, কিন্তু এসে দেখি এখানে অকটেনই নেই।’

ওই পাম্পের কোষাধ্যক্ষ (ক্যাশিয়ার) মো. আমির হামজা বলেন, ‘ক্রেতাদের কারণেই এই সংকট বেড়েছে। যার এক লিটার তেল দরকার, তিনি যদি ১০ লিটার নিয়ে জমিয়ে রাখেন, তবে তো অভাব দেখা দেবেই। ডিজেল ও অকটেন যা ছিল, শুক্রবার বিকেলেই শেষ হয়েছে। এখন অল্প পেট্রল আছে, তাই ভাগ করে সবাইকে দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

তেল সংকটের আতঙ্কে তেল কেনার হিড়িক পড়েছে গত দুদিনে। এরপর ২ লিটারের বেশি তেল না দেওয়ার নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার। কিন্তু পেট্রল বা অকটেন দেওয়া হচ্ছে না পাম্প থেকে। নতুন রাস্তা, খুলনা, ৭ মার্চ | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন  

বেলা ১১টার দিকে নগরের পাওয়ার হাউস এলাকায় খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) পরিচালিত পেট্রলপাম্পে গিয়ে দেখা যায় যানবাহনের দীর্ঘ জটলা। সেখানেও ‘তেল নেই’ লেখা টাঙানো। তবে ক্রেতাদের দাবি, তেল যে আসলেও নেই, তা প্রমাণ করে দেখাতে হবে। এ নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে হইচই ও উত্তেজনা দেখা দেয়।

তেল নিতে আসা খালিশপুরের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘সকাল থেকে চারটি পাম্প ঘুরেছি, সবখানেই বলছে তেল নেই। সত্যি যদি তেল না থাকে, তবে পাম্প চালিয়ে আমাদের দেখাক, আমরা চলে যাব। আমার মনে হয় এটি একটি কারসাজি (সিন্ডিকেট)। ট্যাংক খুলে দেখাক তেল আছে কি না।’

কেসিসি পেট্রলপাম্পের তত্ত্বাবধায়ক (সুপারভাইজার) মজিবুর রহমান বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সরবরাহ কেন্দ্র (ডিপো) থেকে মাত্র ৯ হাজার লিটার ডিজেল পেয়েছি। শুক্র ও শনিবার ডিপো বন্ধ থাকে। আমাদের কাছে এখন সামান্য যেটুকু ডিজেল আছে, তা সিটি করপোরেশনের নিজস্ব গাড়ি—যেমন শহর পরিষ্কারের কাজে ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছে। তেল না থাকলে দেব কীভাবে?’

খুলনা জেলা পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির সহসভাপতি মহিবুল হাসান বলেন, ‘ডিপো থেকে তেল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, অতিরিক্ত দেওয়া হচ্ছে না। গ্রাহকেরা হঠাৎ বেশি করে তেল জমাতে শুরু করেছেন। শুক্র ও শনিবার ডিপো বন্ধ থাকায় সংকট আরও বেড়েছে। রোববার ডিপো থেকে তেল আসার পর ভিড় আরও বাড়তে পারে। তবে দুপুরের পর বেশির ভাগ পাম্পে তেল পাওয়া যেতে পারে।’

মালিকেরা তেল মজুত করছেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ডিপো থেকে তেল আনার কিছুক্ষণের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যাচ্ছে। ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। বেশির ভাগ তেলই সাধারণ গ্রাহকদের কাছে চলে যাচ্ছে। তবে তেলের দাম বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় হয়তো দু-একজন মালিক সামান্য মজুত করতে পারেন।

সিলেট
শুক্রবার রাত ১২টার দিকে সিলেট নগরের কয়েকটি তেল বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ সারি। এর মধ্যে দু-একটি গাড়ি পাম্পে এলেও মোটরসাইকেলের ভিড় দেখে ফিরে যেতে দেখা গেছে। নগরের ভেতরের কয়েকটি পাম্পে মোটরসাইকেলে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। তবে কোনো কোনো পাম্পে চাহিদা অনুযায়ী তেল মিলছে।

সোবহানীঘাট এলাকার বেঙ্গল গ্যাসোলিন ফিলিং স্টেশনে শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে মোটরসাইকেলে ২০০ এবং গাড়িতে ৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। শনিবার সকাল পর্যন্ত এই নিয়ম কার্যকর ছিল। এছাড়া নগরের পাঠানটুলা এলাকার নর্থ ইস্ট পেট্রলপাম্পেও মোটরসাইকেলে ২০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না।

সোবহানীঘাট এলাকার ওরিয়েন্টাল ফিলিং স্টেশনের কর্মী আবিদুর রহমান জানান, গত দুদিন স্বাভাবিকের চেয়ে তেল বেশি বিক্রি হচ্ছিল। শুক্রবার দুপুরের পর ভিড় আরও বেড়ে যায়। মোটরসাইকেল চালকেরা তেলের আধার (ট্যাংকি) পূর্ণ করছেন, অনেকে আবার ৫০০ বা ১০০০ টাকার তেল নিচ্ছেন। খুচরা ১০০ বা ২০০ টাকার তেল খুব কম মানুষই নিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, তাঁদের স্টেশনে পর্যাপ্ত তেল আছে, তাই চাহিদা অনুযায়ী দেওয়া হচ্ছে। তবে পরে হয়তো নিয়ম করে তেল বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

সিলেট নগরের চৌকিদেখি এলাকার ফিলিং স্টেশনে শুক্রবার রাতে জ্বালানি তেল নিতে ভিড় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন   

 সিলেটের সোবহানীঘাট এলাকার বেঙ্গল গ্যাসোলিনের এক কর্মকর্তা জানান, শুক্র ও শনিবার তেলের সরবরাহ বন্ধ থাকে। হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তারা তেল বিক্রির ওপর নিয়ম বেঁধে দিয়েছেন। শুক্রবার থেকে মোটরসাইকেলে ২০০ টাকা ও গাড়িতে ৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। তবে রোববার থেকে সরবরাহ শুরু হলে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাবে।

সিলেট বিভাগীয় পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রিয়াসাদ আজিম জানান, জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। দাম বাড়লেও তা মাসের শেষ দিকে হতে পারে। এক ধরনের আতঙ্কের কারণে মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল সংগ্রহ করছেন, যার ফলে পাম্পগুলোতে ভিড় বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, হঠাৎ ভিড় বেড়ে যাওয়া এবং শুক্র ও শনিবার ডিপো বন্ধ থাকায় সাময়িকভাবে এই কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। এ কারণে পাম্পগুলো তেল বিক্রির পরিমাণ নির্দিষ্ট করতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি সাধারণ মানুষকে অহেতুক আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল না কেনার আহ্বান জানান।

রাজশাহী
শনিবার দুপুর থেকে রাজশাহীর অধিকাংশ পেট্রলপাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। জ্বালানি তেলের জন্য লোকজন এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ছোটাছুটি করছেন। কোনো কোনো পাম্পে তেল পাওয়া গেলেও নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি বিক্রি করা হচ্ছে না।

নগরের কুমারপাড়া এলাকার গুল গফুর পেট্রলপাম্পে এখন শুধু ডিজেল আছে। যানবাহনচালকেরা তেল নিতে এসে ফিরে যাচ্ছেন। শুক্রবার অন্যান্য পাম্প যখন সীমিত তেল দিচ্ছিল বা বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করেছিল, তখনও এই পাম্প থেকে তেল পাওয়া গেছে। তবে শনিবার দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে তারা তেল শেষ হওয়ার ঘোষণা দেয়। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে পাম্প এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

নগরের অক্টোর মোড় এলাকার নয়ান পেট্রলপাম্পে এখনও তেল বিক্রি চলছে। তবে তারা সর্বোচ্চ ৩০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না। পাম্পের কোষাধ্যক্ষ (ক্যাশিয়ার) আব্দুল মুকিত দুপুরে জানান, তাদের কাছে পেট্রল এখনও কিছুটা মজুত আছে। বৃহস্পতিবার তেল আনতে গিয়ে তারা চাহিদার অর্ধেক পরিমাণ পেয়েছিলেন। শুক্র ও শনিবার সরবরাহ বন্ধ থাকায় নতুন তেল আসেনি। রোববার চাহিদামতো তেল পেলে স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

পাম্পে তেল নিতে আসা কোর্ট এলাকার মোটরসাইকেল চালক নাইমুল হক বলেন, ‘শহরের কাটাখালী এলাকা থেকে ফেরার পথে কয়েকটি পাম্পে তেল নেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সবখানে প্রচণ্ড ভিড়। এখানেও অনেক ভিড়, তারপরও ৩০০ টাকার তেল পেয়েছি।’

পাম্পে তেল শেষ অপ্রীতিকর ঘটনায় রাতে পাম্পে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শনিবার রাজশাহী নগরের কুমারপাড়া এলাকার গুল গফুর পেট্রলপাম্পে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন   

রাজশাহী শহরে শুক্রবার সকাল থেকেই পাম্পগুলোতে তেল নেওয়ার জন্য যানবাহনের ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে। অনেকে একবার তেলের আধার (ট্যাংকি) পূর্ণ করার পর সারা দিন গাড়ি চালিয়ে বিকেলে আবারও তেল নিতে আসছেন। এই অতিরিক্ত চাপের কারণে যেসব পাম্পে তেল মজুত আছে, তারা নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল বিক্রি করছে।

শুক্রবার বিকেলে গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ীহাট এলাকার কৃষক মুরসালিন হক তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে মোটরসাইকেলে রাজশাহী শহরে এসেছিলেন। গাড়িতে তেল কম থাকায় তিনি পবা উপজেলার হরিপুর এলাকা থেকে কাশিয়াডাঙ্গা মোড় পর্যন্ত তিনটি পাম্পে তেল নেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি জানান, তিনটি পাম্পের সামনেই দড়ি টাঙিয়ে রাখা হয়েছে এবং গেলেই বলা হচ্ছে তেল নেই। পরে কাশিয়াডাঙ্গা মোড় পার হয়ে একটি পাম্প থেকে ১০০ টাকার তেল সংগ্রহ করতে পেরেছেন তিনি।

শহরের সাগরপাড়া এলাকার আফরিন পেট্রলপাম্পে বিকেল চারটার দিকে অনেক যানবাহনের ভিড় থাকলেও কিছুক্ষণ পরই তারা তেল নেই বলে ঘোষণা দেয়। পরে পাম্পের সামনে দড়ি টাঙিয়ে দেওয়া হয়। শনিবারও সেখানে কোনো তেল পাওয়া যায়নি। নগরের হিরোইন এলাকার শুভ পেট্রলপাম্পেও শুক্রবার রাত ১২টা থেকে তেল শেষ হয়ে গেছে।

বাঘা পেট্রোলিয়াম এজেন্সির স্বত্বাধিকারী গোলাম মোস্তফা জানান, তাঁদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে গত মাসে যে পরিমাণ তেল উত্তোলন করা হয়েছে, তার বেশি তেল আর দেওয়া হবে না। এ কারণে কেউ বোতল বা ড্রামে করে তেল নিতে এলে তা দেওয়া হচ্ছে না। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এভাবে তেল নিয়ে কেউ অবৈধভাবে মজুত করতে পারেন।

নোয়াখালী
নোয়াখালীর পেট্রলপাম্প ও খুচরা তেলের দোকানগুলোতে গত দুদিন ধরে যানবাহনের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে পাম্প ও দোকানগুলোতে নিয়ম বেঁধে কোথাও ১০০ টাকা, আবার কোথাও ২০০ টাকার বেশি তেল বিক্রি করা হচ্ছে না। অনেক খুচরা বিক্রেতা তেলের সংকটের কারণে দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন।

শনিবার দুপুরে জেলা শহর মাইজদীর দুটি পেট্রলপাম্প ও কয়েকটি খুচরা তেলের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি স্থানেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি। বিশেষ করে মোটরসাইকেলের সংখ্যা অনেক বেশি। অনেকে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না।

শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পদ্মা অয়েল কোম্পানির পরিবেশক মেসার্স আবদুল হকের পাম্পের সামনে শতাধিক মোটরসাইকেল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তেল নিচ্ছে। সেখানে প্রতিটি মোটরসাইকেলকে ২০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না।

নোয়াখালীতে পেট্রলপাম্প ও খুচরা জ্বালানি তেলের দোকানগুলোতে মোটরসাইকলসহ বিভিন্ন যানবাহনের ভিড়। শনিবার দুপুরে মাইজদীর একটি পেট্রল পাম্পে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন   

 মোটরসাইকেলচালক জহিরুল হক বলেন, তিনি সাধারণত তেলের আধার (ট্যাংকি) পূর্ণ করে তেল কেনেন, যাতে কয়েক দিন নিশ্চিন্তে চলা যায়। কিন্তু দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে আজ মাত্র ২০০ টাকার তেল পেয়েছেন। তিনি মনে করেন, তেল সংকটের গুজবে একদল মানুষ পাম্পে হুমড়ি খেয়ে পড়ায় সাধারণ ক্রেতারা চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না।

পাম্পের কর্মী মো. হারুন জানান, তাঁদের কাছে মজুত কমে আসায় এখন ২০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরবরাহ কেন্দ্র (ডিপো) থেকেও চাহিদামতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তবে রাতে ডিপো থেকে তেল আসার কথা রয়েছে; তেল এলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

শহরের হাসপাতাল রোড ও সরকারি আবাসিক এলাকার তিনটি খুচরা তেলের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, দুটিতে কোনো তেল নেই। অন্য একটি দোকানে সামান্য তেল থাকলেও বিক্রেতা ২০০ টাকার বেশি বিক্রি করছেন না। হুমায়ূন কবির নামের এক ব্যবসায়ী জানান, আগে যারা ২০০ টাকার তেল কিনতেন, এখন তারা এসে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার তেল চাচ্ছেন। এতেই তেলের সংকট প্রকট হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন জ্বালানি তেল বিক্রয়কেন্দ্রে (ফিলিং স্টেশন) চাহিদামতো তেল না পেয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটির ঘটনা ঘটছে। কোথাও কোথাও তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় পাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সকালে সদর উপজেলার জালকুড়ি এলাকার প্রাইম ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির (প্রাইভেটকার) দীর্ঘ সারি দেখা যায়। সেখানে মোটরসাইকেলে ২০০ টাকার এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে সর্বোচ্চ ১০ লিটার করে তেল দেওয়া হচ্ছে।

মোটরসাইকেল চালক কামরুল ইসলাম বলেন, তেলের জন্য দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, অথচ দেওয়া হচ্ছে মাত্র দুই লিটার অকটেন। এতে তাঁদের মতো চালকদের কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।

প্রাইম ফিলিং স্টেশনের কোষাধ্যক্ষ (ক্যাশিয়ার) মো. সেলিম বলেন, গত বৃহস্পতিবার তাঁরা তেল সংগ্রহ করেছিলেন। প্রতিদিন তাঁদের স্টেশনে প্রায় সাড়ে চার হাজার লিটার অকটেন ও সাড়ে পাঁচ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকে। তবে গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর এই চাহিদা দুই থেকে তিন গুণ বেড়ে গেছে। স্টেশনে যে পরিমাণ তেল আছে, তাতে আর মাত্র এক ঘণ্টা সরবরাহ করা সম্ভব হবে; এরপর বিক্রি বন্ধ করে দিতে হবে।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে জালানী তেল নিতে চৌরঙ্গী ফিলিং স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি। শনিবার দুপুরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন   

এদিকে সাইনবোর্ড এলাকার চৌরঙ্গী ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তেল দেওয়াকে কেন্দ্র করে চালকদের সঙ্গে পাম্প কর্মীদের কথা-কাটাকাটি হয়। চৌরঙ্গী ফিলিং স্টেশনের মালিক আব্দুস সাত্তার জানান, সীমিত পরিমাণে তেল দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। শুক্র ও শনিবার সরবরাহ কেন্দ্র (ডিপো) এবং ব্যাংক বন্ধ থাকায় রোববার দুপুরের আগে নতুন তেল পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

অন্যদিকে তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় শহরের চাষাঢ়া এলাকার আজগর ফিলিং স্টেশন ও বঙ্গবন্ধু সড়কের বলাকা ফিলিং স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। আজগর ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক উত্তম সাহা জানান, যানজটের কারণে আগে থেকেই তাঁদের পাম্পে বিক্রি ও সরবরাহ সীমিত ছিল। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তেল পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। রোববার নতুন করে তেল এলে আবার বিক্রি শুরু করা যাবে।

নড়াইল
নড়াইলের বিভিন্ন জ্বালানি তেল বিক্রয়কেন্দ্রে পেট্রল মিললেও ডিজেল ও অকটেন শেষ হয়ে গেছে। অধিকাংশ কেন্দ্রে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত তেল নেই। ফলে অনেক চালক পাম্প থেকে খালি হাতে ফিরছেন। শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জেলা শহরের কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সরদার ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, তেল নেওয়ার জন্য অকটেন ও পেট্রল সরবরাহের যন্ত্রের সামনে মোটরসাইকেল চালকেরা ভিড় করছেন। কিন্তু পাম্পের কর্মীরা জানাচ্ছেন যে অকটেন নেই। এতে কেউ কেউ পাশের পাম্পে চলে যাচ্ছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে পেট্রল নিচ্ছেন। তবে চাহিদা বেশি থাকায় ২০০ টাকার বেশি পেট্রল দেওয়া হচ্ছে না।

পাম্পের কর্মী মো. লিটন মুন্সী বলেন, ‘আমাদের পাম্পে পর্যাপ্ত তেল ছিল। সাধারণ মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল নেওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে ডিজেল এবং রাতে অকটেন শেষ হয়ে গেছে। এখন সামান্য পেট্রল দিয়ে পাম্প সচল রাখা হয়েছে।’

নড়াইলের মাছিমদিয়ায় সরদার ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে ভিড় করেছেন মোটরসাইকেল চালকেরা। শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন   

পাশের পিষণ ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, তারাও চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে পারছে না। সেখানে ১০০ থেকে ২০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। পাম্পের এক কর্মী জানান, প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল বিক্রি হতো, এখন তার চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বিক্রি বেড়েছে। এই বাড়তি চাপের কারণেই তেলের পরিমাণ সীমিত করতে হয়েছে।

তবে পুরাতন বাস টার্মিনাল এলাকার পান্না পেট্রোলিয়ামের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের কাছে সব ধরনের তেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে। তাই ক্রেতাদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। তারা বর্তমানে মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ৩০০ টাকার, ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেটকার) ও ছোট বাসে (মাইক্রোবাস) ১০০০ থেকে ২০০০ টাকার তেল দিচ্ছে। এ ছাড়া বড় যানবাহনের ক্ষেত্রে বাসে ২৫ থেকে ৩০ লিটার এবং ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানে ১০০ থেকে ১৫০ লিটার পর্যন্ত তেল দেওয়া হচ্ছে।

* প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন