[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

দিনাজপুরে স্ট্রবেরি চাষে চার বন্ধুর সাফল্য

প্রকাশঃ
অ+ অ-
খেত থেকে স্ট্রবেরি তুলে দেখাচ্ছেন চাষি। মঙ্গলবার দুপুরে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রবিপুর গ্রামে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন   

সারি সারি ঝোপালো সবুজ গাছ। গাছের পাতাগুলো প্রায় গোলাকৃতির, চওড়া ও খাঁজকাটা। সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে সাদা ফুল। মাঝখানে হলুদ রেণু, চারপাশে সাদা পাপড়ি। গাছের গোড়ায় লতার সঙ্গে ঝুলে আছে লাল, খয়েরি ও সবুজ রঙের স্ট্রবেরি। স্ট্রবেরির এই খেত দেখতে প্রতিদিন স্থানীয় চাষিদের পাশাপাশি ভিড় করছেন সাধারণ মানুষ।

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রবিপুর গ্রামে স্থানীয় চাষি শাহরিয়ার হোসেন (৪৮), আরিফ হোসেন (৪৪), মনিরুজ্জামান (৪০) ও ছামিউল ইসলাম (৩৩) যৌথ উদ্যোগে ৮৭ শতাংশ জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করছেন। শুধু স্ট্রবেরিই নয়, যৌথ উদ্যোগে শসা, টমেটো, বেগুন, পেয়ারা ও লিচুর বাগান ইজারা নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করেছেন এই চার উদ্যোক্তা।

মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, সারি সারি বেডে আধুনিক পদ্ধতিতে (মালচিং) করা হয়েছে স্ট্রবেরির খেত। সবুজ গাছের ফাঁক দিয়ে প্লাস্টিকের আবরণের (মালচিং পেপার) ওপর শুয়ে আছে কাঁচা ও পাকা স্ট্রবেরি। ১২ জন শ্রমিকের মধ্যে কেউ ফল সংগ্রহ করছেন, কেউ আগাছা পরিষ্কারের কাজ করছেন। খেতের কোণায় একটি ছোট ঘর (টংঘর) বানানো হয়েছে। দিনরাত খেতের নিরাপত্তায় পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

স্ট্রবেরির খেতে গাছের পরিচর্যা করছেন একজন কৃষিশ্রমিক। মঙ্গলবার দুপুরে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রবিপুর গ্রামে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন   

উদ্যোক্তারা জানান, মোট ৮৭ শতাংশ জমির মধ্যে ২০ শতাংশ জমিতে বিশেষ ছাউনি (পলিনেট হাউস) দিয়ে চারা তৈরি করা হচ্ছে। বাকি ৬৭ শতাংশ জমিতে উইন্টারডন, ফেস্টিভ্যাল ও আমেরিকান ফেস্টিভ্যালসহ চার জাতের ১৫ হাজার স্ট্রবেরি গাছ লাগিয়েছেন তাঁরা। প্রায় প্রতিটি গাছেই ফল ধরেছে। সাধারণত অক্টোবর মাসের শেষ দিক চারা লাগানোর উপযুক্ত সময় হলেও তাঁরা নভেম্বরের শেষে চারা রোপণ করেছেন। ৭৫ দিনের মাথায় ফল তোলা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে সাড়ে আট মণ স্ট্রবেরি সংগ্রহ করেছেন তাঁরা। গড়ে প্রতি কেজি ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এবার প্রায় ১৫০ মণ স্ট্রবেরি পাবেন বলে তাঁরা আশা করছেন। জমি ভাড়া, সার, বীজ, বালাইনাশক ও শ্রমিক খরচ বাদে এই মৌসুমে সাত থেকে আট লাখ টাকা লাভের আশা করছেন এই উদ্যোক্তারা।
চার উদ্যোক্তার শুরুর গল্প

পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিকাজ করতেন ছামিউল। ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে লাভজনক ও নতুন জাতের ফসল সম্পর্কে খোঁজ রাখতেন তিনি। ২০২৩ সালে রংপুরের এক বন্ধুর কাছ থেকে স্ট্রবেরির চারা এনে চাষ শুরু করেন। সেবার খুব বেশি লাভ করতে পারেননি। পরের বছর এক বিঘা জমিতে জয়পুরহাট থেকে চারা এনে চাষ করেন। সেবারও লাভ হয়েছে সামান্য। কৃষির প্রতি ছামিউলের এমন আগ্রহ দেখে এগিয়ে আসেন প্রতিবেশী শাহরিয়ার হোসেন, আরিফ ও মনিরুজ্জামান। এরপর জমি ইজারা নিয়ে সবাই মিলে শুরু করেন স্ট্রবেরিসহ অন্যান্য ফসলের চাষাবাদ।

শাহরিয়ার বলেন, ‘কৃষির প্রতি ছামিউলের খুব আগ্রহ ছিল। কিন্তু টাকার অভাবে তিনি এগোতে পারছিলেন না। তাঁর সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগায় আরও দুজনকে সঙ্গে নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করি। বর্তমানে ১২ একর জমিতে আমরা যৌথভাবে বিভিন্ন ফসল আবাদ করছি। এবার কৃষি বিভাগেরও সহযোগিতা পেয়েছি। স্ট্রবেরিতে লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা দেখে খুবই ভালো লাগছে। এর আগে শসা ও টমেটোতেও আমরা লাভ পেয়েছি।’

সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে লাল স্ট্রবেরি। মঙ্গলবার দুপুরে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রবিপুর গ্রামে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন   

উদ্যোক্তা ছামিউল বলেন, ‘খুবই ভালো লাগছে। স্ট্রবেরি খেত দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছেন। অনেকে আগেভাগেই চারার কথা বলে রাখছেন। অনেকেই চাষাবাদে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কয়েক দিনের মধ্যে কন্দ থেকে চারা সংগ্রহের কাজ শুরু করব। এরপর সেই চারা বিশেষ ছাউনিতে (পলিনেট হাউস) রাখা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছর অন্য কোথাও থেকে চারা আনতে হবে না, বরং আমরাই চারা বিক্রি করতে পারব। এরই মধ্যে ফেসবুকে “বিরল অ্যাগ্রো হাব” নামে একটি পাতা (পেজ) খুলেছি। সেখানে আমাদের চাষবাসের ছবি ও ভিডিও আপলোড করছি।’

গত মঙ্গলবার ছামিউলদের খেত দেখতে আসেন কাহারোল উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রুহুল কুদ্দুস। তিনি বলেন, ‘স্ট্রবেরি চাষের কথা শুনে দেখতে এসেছি। খুবই ভালো লাগছে। ঠিক করেছি, আগামীবার নিজেও আবাদ করব। চারার বিষয়ে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁরা চারা দিতে চেয়েছেন।’

কৃষি বিভাগ জানায়, স্ট্রবেরি একটি শীতকালীন লতানো গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। উর্বর দোআঁশ থেকে বেলে দোআঁশ মাটি এই ফল চাষের জন্য উপযোগী। অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত এটির চাষ হয়। বিশেষ পদ্ধতিতে বেড তৈরি করে চাষাবাদ করতে হয়। একটি গাছে গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি ফল ধরে, যার মোট ওজন ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে।

বিরল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুম্মান আক্তার বলেন, ‘দিনাজপুর যেহেতু শীতপ্রধান এলাকা, এখানে স্ট্রবেরি চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিভাগ বিশেষ প্রকল্পের আওতায় এই উদ্যোক্তাদের সার, কৃষি উপকরণ ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছে। অন্যান্য ফল-ফসলের পাশাপাশি স্ট্রবেরি চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে আমরা কাজ করছি।’

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন