[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

লোকসানের মুখে আমগাছ কেটে ফেলছেন খাগড়াছড়ির চাষিরা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
বাগানের আমগাছ কেটে ফেলে রেখেছেন চাষি। খাগড়াছড়ি সদরের গোলাবাড়ি ইউনিয়নের তুন্যমাছড়া এলাকায়। গত বুধবার তোলা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন   

আর কিছুদিন পরই শুরু হবে আমের মৌসুম। এরই মধ্যে গাছে মুকুল ফুটেছে, কোথাও কোথাও ছোট ফলও ধরেছে। কিন্তু এমন সময়েও খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক আমগাছ কেটে ফেলছেন চাষিরা। তাঁদের দাবি, সড়কে অতিরিক্ত টোল আদায় ও পরিবহন সমস্যার কারণে আমের ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে আমগাছ কেটে ফেলছেন তাঁরা। এসব জায়গায় এখন বিকল্প ফল বা সবজি চাষ করবেন বলে জানিয়েছেন চাষিরা।

খাগড়াছড়ি শাপলা চত্বর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে গোলাবাড়ি ইউনিয়নের তুন্যমাছড়া গ্রাম। সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার আমগাছ লাগিয়েছিলেন জ্ঞান জ্যোতি চাকমা। আগে মৌসুম শুরু হলেই তাঁর বাগান ঘিরে থাকত উৎসবমুখর পরিবেশ। শ্রমিকদের ব্যস্ততা, পাইকারদের আনাগোনা আর আমবোঝাই ঝুড়ি—সবকিছুর দেখা মিলত সেখানে। এরপরও লোকসানের কারণে তিনি বাগানের একটি অংশের গাছ কেটে ফেলেছেন।

সম্প্রতি জ্ঞান জ্যোতি চাকমার বাগানে গিয়ে দেখা যায়, একের পর এক আমগাছ কাটছেন তিনি। তাঁর বাগানে রাংগুই, আম্রপালি, বারি-৪-সহ বিভিন্ন জাতের আমের গাছ রয়েছে। তিনি জানান, এরই মধ্যে ১ হাজার ২০০ আমগাছ কেটে ফেলেছেন। তাঁর অভিযোগ, আমের গাড়ি থেকে টোল আদায়ের নামে জেলা পরিষদের চাঁদা, বাজার ফান্ড ও পৌরসভার রাস্তায় রাস্তায় টোল দিতে হয়। সব মিলিয়ে লাভের চেয়ে খরচই বেশি হয়ে যাচ্ছে। বাজারেও ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে তিনিসহ অনেক বাগানমালিক বাধ্য হয়ে গাছ কেটে ফেলছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, খাগড়াছড়িতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৯০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। চলতি বছরের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। গত বছর জেলায় ৬২ হাজার ১৭৯ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়েছিল। পাহাড়ি ঢাল ও সমতল মিলিয়ে গত এক যুগে খাগড়াছড়িতে আম চাষ অনেক বেড়েছে। এর মধ্যে রাংগুই ও আম্রপালি জাতের আমের চাষই বেশি হয়।

বাগানমালিকদের দাবি—সার, কীটনাশক, সেচ, পরিচর্যা ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে আম উৎপাদনের খরচ কয়েক গুণ বেড়েছে। একসময় শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ২০০ থেকে ৪০০ টাকা, যা এখন বেড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্গম এলাকায় শ্রমিকসংকটও দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অতিরিক্ত টোল। এসব কারণে তাঁরা বাণিজ্যিক আম চাষ কমিয়ে দিচ্ছেন।

পেরাছড়া এলাকার বাগানমালিক মিত্র চাকমা বলেন, ‘আমার বাগানে প্রায় ১০০ রাংগুই আমের গাছ ছিল। কয়েক বছর ধরে খরচই উঠছে না। মৌসুম শেষে দেখা যায় উল্টো ঋণ বাড়ছে। তাই অনেকটা অভিমান করেই গাছগুলো কেটে ফেলেছি।’

চলতি বছরের আমের মৌসুম এখনো শুরু হয়নি, তাই এখনকার টোল আদায়ের হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে গত বছরের চিত্র ছিল বেশ উদ্বেগের। জেলার ব্যবসায়ী ও চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খাগড়াছড়ি থেকে অন্য জেলায় আম নেওয়ার সময় পৌরসভা খাঁচা (ক্রেট) প্রতি ১০ টাকা করে টোল আদায় করে। এই হিসাবে দুই হাজার কেজি আমবোঝাই একটি পিকআপের জন্য ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা টোল দিতে হয়।

পৌরসভার টোলের পর জেলা পরিষদকেও টাকা দিতে হয়। জেলা পরিষদের অধীন ‘বাজার ফান্ড’ চেঙ্গী সেতু এলাকায় খাঁচা (ক্রেট) প্রতি ১০ টাকা করে টোল আদায় করে। এখানেও ২ হাজার কেজি আমবাহী একটি পিকআপকে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা দিতে হয়। একই সংস্থা জেলা থেকে বের হওয়ার সময় রামগড় ও মানিকছড়ি এলাকায় গাড়িপ্রতি আরও ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আদায় করে। এর বাইরে বিভিন্ন স্থানীয় সংগঠনও চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নেয়।

বাগানমালিকদের অভিযোগ, আম পরিবহনের পথে পথে একাধিক জায়গায় টোল দিতে হয়। এতে পাইকারদের খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা বাগান থেকে কম দামে আম কিনতে চান। যার পুরো চাপ পড়ে চাষিদের ওপর। মরাটিলা এলাকার চাষি সত্যজিৎ ত্রিপুরা বলেন, ‘আমার বাগান দুর্গম এলাকায় হওয়ায় পরিবহন খরচ এমনিতেই বেশি। এর ওপর জায়গায় জায়গায় অতিরিক্ত টোলের কারণে কয়েক বছর ধরে পাইকাররা সহজে আসতে চান না। অনেকে এলেও দাম কম বলেন।’

খাগড়াছড়ি বাগান মালিক সমিতির উপদেষ্টা অনিমেষ চাকমা বলেন, ‘খাগড়াছড়ি জেলায় যেভাবে টোল আদায় করা হয়, দেশের আর কোথাও এমনটি হয় না। এতে বাগানমালিকেরা নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। আমরা এসবের বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন ও স্মারকলিপি দিয়েও কোনো সমাধান পাইনি। তাই নিরুপায় হয়ে চাষিরা গাছ কেটে ফেলছেন।’

প্রতি মৌসুমে খাগড়াছড়ির আমবাগানে কাজ করে হাজারো শ্রমিক জীবিকা নির্বাহ করেন। পরিবহনকর্মী ও প্যাকেজিং ব্যবসায়ীরাও এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। আমগাছ কমে যাওয়ায় তাঁরাও দুশ্চিন্তায় আছেন। তৈফা ত্রিপুরা নামে এক শ্রমিক বলেন, বাগান কমে গেলে তাঁদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। ফল ব্যবসায়ী আবদুল মালেক বলেন, সঠিক সংরক্ষণ ও বাজারজাত করার সুবিধা থাকলে এই আম বিদেশেও রপ্তানি করা যেত। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে।

অনলাইনে আম বিক্রেতা মেহেদি ও উখ্যামং মারমা জানান, খাগড়াছড়ির আমের স্বাদ ভালো হলেও পরিবহন ও টোলের কারণে ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী জানান, কৃষকেরা গাছ কাটছেন—এমন তথ্য তাঁদের জানা নেই। কোনো কৃষক পরামর্শ চাইলে তাঁরা গাছ না কাটার জন্য উৎসাহিত করতেন। এরপরও যাঁরা গাছ কেটেছেন, তাঁদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘চাঁদা বা অতিরিক্ত টোলের বিষয়ে জেলা প্রশাসন সব সময় সতর্ক আছে। গত বছরগুলোতেও টোলকেন্দ্রগুলোয় অভিযান চালানো হয়েছিল। সামনে আমের মৌসুমেও এই নজরদারি বজায় থাকবে।’ 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন