‘মিঠা’ রাষ্ট্রপতি, ‘তিতা’ রাষ্ট্রপতি!
![]() |
| ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও ২০২৬ সালের সংসদ অধিবেশনের আলোকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা ও বিরোধীদলের দ্বিচারিতা; রাজনৈতিক স্বার্থ ও সংবিধান—কোথায় রেখার সীমা | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন |
এই লেখার মধ্যে বাড়তি কোনো রসদ নেই। আমরা আসলে সবই জানি এবং বুঝি। শুধু যা আছে, তা হলো দুই সময়ের ব্যবধানে একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বিচারী অবস্থান। আর আলোচনার কেন্দ্রে আছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। বর্তমান রাষ্ট্রপতি তো বটেই, ভবিষ্যত রাষ্ট্রপতিও।
ফিরে যাই ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টে। গণ-অভ্যুত্থানের সফল পরিণতির পর সেই সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্ব তথা বেশ কয়েকজন বৈষম্যবিরোধী সমন্বয়ক। এরপর নানা ঘটনা পরম্পরায় এল ৮ অগাস্ট। সেদিন সংবিধান সমুন্নত রেখে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলী। সেই উপদেষ্টামণ্ডলীতে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে দুজন ছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতা, নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া।
ফিরে আসি ২০২৬ সালের ১২ মার্চে। সেদিনের ছাত্র-উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম রাজনীতির মঞ্চে আরেক ধাপ এগিয়ে এখন সংসদ সদস্য এবং বিরোধীদলীয় চিপহুইপ। তিনি ও তার বিরোধীদলীয় মিত্ররা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করেছেন। রাষ্ট্রপতি সংসদ অধিবেশনে প্রবেশের আগেই হট্টগোল করেছেন। রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’। এই অভিযোগের ভিত্তিতে তারা অবশ্য আগেই সংসদকে অসহিষ্ণু করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। যেমন কথা, তেমন কাজ। সাধুবাদযোগ্যই বটে!
তবে, নাহিদ ইসলামরা সম্ভবত ভুলে গেছেন, চব্বিশের অগাস্টের সেই শুরুর দিনগুলোর কথা। একটি রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থান মাত্র সফল হয়েছে। রক্তের দাগে রাজপথ তখনও রঞ্জিত। জলজ্যান্ত স্মৃতি। ঠিক সে সময়টিতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে কারোরই ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ মনে হয়নি। কারণ, তখন হাতছানি দিচ্ছিল হঠাৎ পাওয়া ক্ষমতা!
এখন তাদের নানারকম যুক্তি উপস্থাপিত হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, রাষ্ট্রপতিকে নাকি তখন অপসারণের হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছিল! মানুষ স্মৃতিভ্রষ্ট হতে পারে। কিন্তু, মাত্র ১৯ মাস আগের ঘটনা বোধহয় মানুষ এত সহজে ভুলবে না। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট থেকে ৮ অগাস্টের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের কোনো তথ্য বা ঘটনার উদাহরণ কেউ দিতে পারবেন না। বরং, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে রাষ্ট্রপতি হয়ে উঠেছিলেন তখন সংবিধানের প্রধান রক্ষাকবচ। আজকে এসব ব্যাখ্যা দেওয়া মানে ঘটনার অতিরঞ্জন ছাড়া আর কিছুই না।
রাষ্ট্রপতি তখন যদি ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ না হয়ে থাকেন, তাহলে ১ বছর ৭ মাস ৪ দিন পর, ২০২৬ সালের ১২ মার্চে এসে তাকে সেই তকমা দিলে সেটা আর গ্রহণযোগ্য থাকে না। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে তার স্বাক্ষরে ১৩৩টি ‘অধ্যাদেশ’ জারি হয়েছে। এমনকি আদেশের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির না থাকলেও তার স্বাক্ষরেই বহুলচর্চিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ও আদেশ আকারে জারি হয়েছে। নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াদের তখন তাকে দোসর মনে হয়নি। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে যখন বঙ্গভবন অভিমুখে যাত্রা করেছিল কিংবা বঙ্গভবনের সামনে অবস্থান করেছিল তাদেরই ‘নীরব সমর্থনপুষ্ট’ বিক্ষুব্ধ জনতা, তখন আজকের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের কাউকেও একটা কথা বলতে শোনা যায়নি। কারণ, প্রিয়জন হওয়ার প্রশ্ন না থাকলেও, তিনি ছিলেন তখন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য প্রয়োজনের আধার।
তবুও, এগুলো বাদ রেখেই শুধু ২০২৪ সালের ৮ অগাস্টের কথা বারংবার মনে করিয়ে দিতে চাই। সেই শপথ কেন পড়েছিলেন নাহিদ ইসলামরা? অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন জানিয়েছিল অভ্যুত্থানের পক্ষের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলই। স্বভাবতই শপথ অনুষ্ঠানেও তারা গিয়েছিলেন, গিয়েছিলেন জুলাইয়ের শিক্ষার্থী নেতৃত্বও। আজকের বিরোধীদল বা জোট নেতাদের অনেকেই সেই শপথ অনুষ্ঠানের অতিথি হিসেবে বঙ্গভবনে কেন গিয়েছিলেন?
সেদিন রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ করানো যদি জায়েজ হয়ে থাকে, তাহলে আজকে সেই একই রাষ্ট্রপতির সংবিধানের বিধিবদ্ধ ধারা, সংসদের কার্যপ্রণালী ও রেওয়াজ অনুযায়ী ভাষণ দেওয়ায় আপত্তি কেন থাকবে? এই দ্বিচারিতা কেন? সেদিনের রাষ্ট্রপতি ‘মিঠা’ ছিলেন, ভালো ছিলেন; আজকের রাষ্ট্রপতি ‘তিতা’ হয়ে গেছেন, খারাপ হয়ে গেছেন!
২.
রাষ্ট্রপতির সংসদ অধিবেশনে ভাষণ সংবিধান দ্বারা বিধিবদ্ধ। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি মোতাবেক, জাতীয় সংসদের প্রত্যেকটি সাধারণ নির্বাচনের পর প্রথম অধিবেশনের সূচনায় এবং প্রতি বছরের প্রথম অধিবেশনের সূচনায় মহামান্য রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণ প্রদানের কথা বলা হয়েছে।
সংবিধানে নির্ধারিত বিধি মোতাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারেন যারা, তারা রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণ দেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি জানালে, সেটিকে সাংবিধানিক দ্বিচারিতা ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ আসলে নেই। নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী সংবিধানকে ব্যবহার করার ‘পুরোনো রোগ’ আবার ফিরে এলে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।
দেখা গেল বক্তব্যের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি সংসদ অধিবেশনে প্রবেশের আগেই বিরোধীদলীয় শিবির দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ শুরু করেছেন। কিন্তু, বিস্ময়কর বিষয়, তিনি প্রবেশ করতেই যখন জাতীয় সংগীত শুরু হলো, তখন তারা বসে পড়লেন। বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কয়েকবার ‘ন্যাশন্যাল এন্থেম’ উচ্চারণ করে বিরোধীদলীয় সদস্যদের দাঁড়ানোর ইঙ্গিত বা অনুরোধ করলে, তারা দাঁড়ালেন বটে, কিন্তু হাতে ধরে রাখলেন ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ কার্ড। জাতীয় সংগীত চলাকালীন শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কিছু রাষ্ট্রীয় বিধি আছে। সেগুলোরও এক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটল। অন্য কোথাও যাই হোক, মহান জাতীয় সংসদের মতো সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জাতীয় সংগীতের এই অবমাননা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ন্যাক্কারজনক নজির স্থাপন করল!
রাষ্ট্রপতি যিনিই হন, এটি একটি সাংবিধানিক পদ। এখানে ব্যক্তি নন, পদটিই মুখ্য। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে মো. সাহাবুদ্দিনের চেয়ে শ্রেয়তর ও যোগ্যতর ব্যক্তি ছিলেন, যিনি রাষ্ট্রপতির মতো বিশালাকায় পদ অলংকৃত করতে পারতেন। কিন্তু, যেহেতু তিনি অলংকৃত করেছেন, সেহেতু তার অতীত ইতিহাস ও পদপদবি পরবর্তী সময়ে লঘু হয়ে যায়। মুখ্য হয়ে ওঠে পদটিই। সেই সাংবিধানিক পদকে অপমান করা এক অর্থে সংবিধানের বরখেলাপই বটে। সংবিধান অবমাননার এই উন্মত্ততা বাংলাদেশে চলতেই থাকবে?
৩.
রাষ্ট্রপতি আজকে যে ‘তিতা’ বা খারাপ হয়ে গেছেন, এর অন্যতম কারণ হতে পারে সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমে দেওয়া তার সাক্ষাৎকার। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক অভিভাবক। এমন পদে থেকে অমন সাক্ষাৎকার দেওয়া যথাযথ হয়েছে কি না, সেটি নিয়ে অবশ্যই আলোচনা-সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু, তার মানে এই নয় যে, সমালোচনা করলেই তাকে পদচ্যুত বা অপমানিত করা হবে। এটা মোটেও কোনো গণতান্ত্রিক মানসিকতা হতে পারে না।
যাই হোক, এর আগে রাষ্ট্রপতি যেখানেই যে বক্তব্য দেন না কেন, দলিল হিসেবে সেগুলোর গুরুত্ব সংসদে দেওয়া ভাষণের তুলনায় অত্যন্ত লঘু। এ ভাষণ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে দেওয়ায় তা সংসদের কার্যবিধির অংশ হিসেবে জাতীয় দলিল হিসেবে নথিভুক্ত থাকবে, ভবিষ্যতে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এই বক্তব্যের তাৎপর্য তাই অনেক।
এই বক্তব্যের ভাষা যারই লেখা হোক না কেন, নিঃসন্দেহে সরকারি দল বিএনপির পরিপূর্ণ অভিপ্রায় এতে প্রকাশিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের নিয়োগ করা রাষ্ট্রপতির এ ভাষণের সঙ্গে পূর্বে বিএনপির নিয়োগ করা রাষ্ট্রপতিদের ভাষণের তেমন কোনো তারতম্যও আসলে নেই। ভবিষ্যতে যিনি রাষ্ট্রপতি হবেন, তার বক্তব্যও এর চেয়ে ভিন্ন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম, তা যতই সাংবিধানিক পদগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আসুক না কেন।
এ বাবদ, বিরোধীরা আজকে বিএনপির বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেছেন বলে ধরে নিতে হবে। সে প্রসঙ্গেই এখন একটি অনুমাননির্ভর আলোচনা করব আমরা।
৪.
বিরোধীদের এই বিদ্রোহের রাজনীতিটা আসলে সুদূরপ্রসারী চিন্তা থেকেই করা। খেয়াল করেন, নিজেদের জন্য ক্ষমতার অভূতপূর্ব সুযোগ এনে দেওয়া সেই ৮ অগাস্ট নাহিদ ইসলামদের কাছে নিষ্পাপ, কিন্তু আজকের ১২ মার্চ পাপবিদ্ধ! কেন? বিরোধীদলের আচরণ বলছে, রাষ্ট্রপতিকে বিব্রত করে এই অধিবেশনেই তাকে অভিসংশন করতে সরকারি দলকে বাধ্য করবে তারা। কিংবা, এমন পরিস্থিতি তৈরি করবে যেন রাষ্ট্রপতি নিজেই বিব্রত হয়ে পদত্যাগ করেন।
এর কারণ এটা নয় যে, রাষ্ট্রপতি নিজের আওয়ামী তকমা ফেলে দিয়ে বিএনপির রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠার সকল দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত তৈরি করে ফেলেছেন। কারণ এটাও নয় যে, এই রাষ্ট্রপতিকে দ্রুততম সময়ে সরিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি আনতে পারলে বিরোধীদের বিশাল লাভ হবে। কেননা তিনি আরও বড় ‘নন-হাইব্রিড’ বিএনপিপন্থী রাষ্ট্রপতিই হবেন। তাহলে, বিরোধীদের এই দ্বিচারিতার কারণ কী? জুলাই চেতনা? মোটেও না। জুলাই চেতনার ফুল সেদিনই তাহলে মরে গেছে, যেদিন আওয়ামী লীগের নিয়োগ করা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বসে তারা সরকার গঠনের কৌশল নির্ধারণ করেছেন এবং যেদিন তার কাছে তারা শপথ নিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে, সত্য শুধু ততটুকু নয়, যতটুকু চোখে দেখা যায়।
আজকে প্রথম অধিবেশনে গঠিত বিভিন্ন কমিটির সদস্যদের নাম দেখেন। বিএনপির সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম শোনা গেছে, খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ তারা প্রায় সবাই আছেন বিভিন্ন কমিটিতে। মোশাররফ হোসেন প্রথম অধিবেশনের শুরুতে স্পিকারের আসনে বসে সভাপতিত্বও করেছেন। এই পদক্ষেপগুলো কী ইঙ্গিত দেয়? ইঙ্গিত দেয় যে, সহসাই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হচ্ছে না! কেন? কারণ, বিএনপি এটা চায় না। এ কথা আগেও তাদের নেতারা বলেছেন। কেন বলেছেন? সম্ভবত হিসাব কষেই বলেছেন।
হিসাব মতে, বর্তমান সরকারের মেয়াদ ২০৩১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সংবিধান সংস্কার হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে আগামী চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০৩১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সেই নির্বাচন হতে পারে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে যদি নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হয়, তাহলে তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে ২০৩১ সালের মার্চে। সে সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য যেহেতু সংসদ থাকবে না, সেহেতু একটা সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে। রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে তখন স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হতে পারেন।
অন্যদিকে, সংস্কারের মধ্য দিয়ে সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ালে যে ভারসাম্য আসবে, তাতে নির্বাচনকালীন রাষ্ট্রপতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন। বিদায়ী সংসদের স্পিকারের দ্বারা এই পরিস্থিতি সামলানো কতটা সম্ভব হবে, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। ফলে, আওয়ামী লীগের দ্বারা নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে নিজেদের ভবিষ্যত প্রয়োজনের স্বার্থেই দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের ক্ষমতাপ্রাপ্ত সরকারি দল বিএনপি অন্তত আরও কিছুকাল (কে জানে, হয়তো পূর্ণ মেয়াদও!) স্বীয় পদে রাখবে বলে অনুমান করা যায়। অন্তত, পরবর্তী রাষ্ট্রপতির জন্য তারা এমন একটি মেয়াদ নিশ্চিত করতে চাইবে, যেন আগামী সংসদ নির্বাচনের পরও তার মেয়াদ অবশিষ্ট থাকে।
জামায়াত ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট বিএনপির এই ‘অদৃশ্য পরিকল্পনা’য় বাগড়া দিতেই হয়তো বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে বিব্রত করতে চাইছে। কারণ, এই বিরোধী জোট এবার তাদের সর্বোচ্চ লক্ষ্যের চেয়েও আশাতীত ফল করেছে। আগামী নির্বাচনও যদি এবারের মতো এই দ্বি-দলীয় জোটগত বৃত্তেই ঘুরপাক খায় এবং নানা কারণে আওয়ামী লীগের ফেরা অনিশ্চিত থাকে, তাহলে আজকের বিরোধীদল মরণ কামড়ই দিতে চাইবে আগামীর ভোটের মাঠে। এজন্যই হয়তো তারা আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের সুদূরপ্রসারী রণপরিকল্পনা সাজাচ্ছে। নিঃসন্দেহে সেই রণপরিকল্পনায় পরবর্তী রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে সংকট তৈরি করতে পারা তাদের একটি আগাম সুবিধা দিলেও দিতে পারে। সেজন্যই তারা বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে জুলাই চেতনার নামে বিব্রত করার পথ হয়তো বেছে নিয়েছে।
৫.
সেই ৫ অগাস্ট থেকেই আওয়ামী লীগারদের মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে হাহাকারের অন্ত নেই, তিনি তাদের কাছে এক বিয়োগান্তক ‘তিতা’ ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু, তিনি কবে কখন বিএনপির কাছে ‘মিঠা’ ছিলেন, তা ভাবা শক্ত। তবে, ‘কনিস্টিটিউয়েন্সি পলিটিক্সে’ প্রভূত অভিজ্ঞতালব্ধ বিএনপির কাছে অন্তত চব্বিশের ৫ অগাস্ট থেকে আজকে সংসদে দেওয়া ভাষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কখনই ‘তিতা’ ছিলেন না। এবং সেটা সাংবিধানিক প্রয়োজনেই। বিএনপি রাজনীতির স্বার্থেই সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে চেয়েছে। কিন্তু, বিরোধীরা বারংবার সংবিধান থেকে বিচ্যুত হতে চেয়েছে। এটা রাজনীতির ভেতরে এক ধরনের বিরাজনৈতিক পদক্ষেপই বলা যায়। জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির সংবিধান নির্ধারিত ভাষণ বর্জন করা সেই বিরাজনীতিকরণেরই অংশ।
মার্কিন মনস্তত্ত্ববিদ স্টিভ মারাবলি বলেছিলেন, ‘মুরগীর ছানার সঙ্গে থাকলে আপনি বড়জোর মাটিতে খুঁটে খুঁটে খাবেন, কিন্তু ঈগলের সঙ্গে ঘুরলে আপনার সীমা হবে আকাশ।’ আমাদের ‘বিজ্ঞ ও অতিবিজ্ঞ’ রাজনীতিকরা বিরাজনীতিকরণ বাদ দিয়ে ‘কনিস্টিটিউয়েন্সি পলিটিক্স’ তথা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির জ্ঞানার্জন করে ঈগল হয়ে উঠুন।
* মতামত লেখকের নিজস্ব

Comments
Comments