ঠাকুরগাঁওয়ে লিচু বাগানে মুকুলের বদলে নতুন পাতা, ফলন নিয়ে শঙ্কায় চাষিরা
![]() |
| লিচুগাছে এসেছে নতুন পাতা। গত সোমবার ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার গোবিন্দনগর এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
গ্রামের মেঠো পথগুলো এঁকেবেঁকে চলে গেছে বহুদূর। রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ লিচুগাছ। গাছগুলো এখন সবুজ আর তামাটে পাতায় ঢাকা। কোথাও কোথাও পাতার আড়ালে দুলছে লিচুর মুকুল। সাধারণত মাঘের শেষ থেকে ফাল্গুনের মাঝামাঝি সময়ে লিচুগাছে মুকুল আসে। এই সময় বাগান পরিচর্যায় চাষিরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং মুকুল দেখেই ব্যবসায়ীরা বাগান কিনে নেন।
তবে এবার ঠাকুরগাঁওয়ের লিচুবাগানগুলোর চিত্র ভিন্ন। অধিকাংশ গাছে মুকুলের বদলে নতুন পাতা দেখা যাচ্ছে। যেসব গাছে মুকুল এসেছে, সেখানেও কচি পাতার সংখ্যাই বেশি। চাষিরা জানান, যেসব ডালে নতুন পাতা বের হয়, সেখানে ফলন হয় না। ফলে এবার লিচু উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই জেলায় চায়না থ্রি, বোম্বাই, মাদ্রাজি, কাঁঠালি ও গোলাপি জাতের লিচু চাষ হয়। বেলে-দোআঁশ মাটি লিচু চাষের জন্য উপযুক্ত হওয়ায় এখানে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২৮১ হেক্টর জমিতে ৬৪১টি লিচুবাগান রয়েছে। এবার লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩১৬ মেট্রিক টন।
সদর উপজেলার গোবিন্দনগর এলাকার চাষি সতীশ বর্মণ জানান, তাঁর ২৫০টি গাছের মধ্যে এবার ৫০টিতেও মুকুল আসেনি। প্রায় সব গাছ নতুন পাতায় ভরে গেছে। পাশের বাগানের মালিক আবদুস সালাম জানান, মুকুল ও নতুন পাতা একসঙ্গে বের হলে ফলের আকার বড় হয় এবং রোগবালাই কম হয়। কিন্তু মুকুল না আসায় লোকসানের ভয় কাজ করছে।
আকচা গ্রামের লিচুচাষি আহসান হাবিব এবং নারগুন এলাকার কৃষক জাহাঙ্গীর আলমও একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন। ফেনী থেকে আসা ফল ব্যবসায়ী নুর ইসলাম জানান, প্রতিবছর তাঁরা মুকুল দেখেই বাগান কেনেন। কিন্তু এবার নতুন পাতার কারণে ফলন কেমন হবে, তা আন্দাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফল ব্যবসায়ী নুর ইসলাম জানান, গত বছরের তুলনায় এবার বাগানের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এ বছর ২০০টি লিচুগাছ তাঁকে কিনতে হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকায়, যেখানে গত বছর ১০০টি গাছ কিনতে খরচ হয়েছিল মাত্র দেড় লাখ টাকা। এবার অধিকাংশ গাছে মুকুল না আসায় যেসব গাছে মুকুল এসেছে, সেগুলোর দাম অনেক বেড়ে গেছে। এর ফলে বাজারে লিচুর দামও এবার বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক নাসরীন জাহান বলেন, লিচুগাছে প্রতিবছর সমানভাবে মুকুল আসে না; কখনো বেশি হয়, আবার কখনো কম। তবে এবার তুলনামূলকভাবে খুব কম গাছে মুকুল দেখা যাচ্ছে। এটি প্রাকৃতিক কারণে হতে পারে। এছাড়া এবার শীতের তীব্রতাও কিছুটা কম ছিল। অন্যদিকে, মুকুলের গুটি শক্ত হওয়ার আগে সেচ দেওয়া হলে ফুল আসার প্রাণরস বা হরমোন কমে যায় এবং বাড়ন্ত হরমোন বেড়ে যায়। মূলত এই হরমোনের অসামঞ্জস্যতার কারণেই গাছে মুকুলের বদলে সবুজ কচি পাতা দেখা দিচ্ছে।
দিনাজপুর উদ্যানতত্ত্ব কেন্দ্রের উদ্যানতত্ত্ববিদ মাসকুরা খাতুন জানান, মুকুল আসার সময় গাছের গোড়ায় পানি ও সার দেওয়া হলে গাছে কচি পাতা চলে আসে। আর একবার কচি পাতা এসে গেলে সেই গাছে আর মুকুল ধরে না। তাই মুকুল আসার অন্তত দেড় থেকে দুই মাস আগে থেকেই লিচুগাছে সার ও পানি দেওয়া বন্ধ রাখতে হয়।

Comments
Comments