বরিশালে আদালতে টানা তিন দিন অচলাবস্থা
![]() |
| বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমানকে গ্রেপ্তারের পর আদালত প্রাঙ্গনে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও র্যাবের সদস্যরা মোতায়েন ছিলেন। গতকাল বুধবার আদালত প্রাঙ্গনে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
বরিশালে আদালতের এজলাসে হট্টগোল, বেঞ্চে ধাক্কাধাক্কি ও ভাঙচুরের ঘটনার জেরে টানা তিন দিন ধরে আদালতের কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে আছে। বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের আদালত বর্জনের মধ্যে বুধবার আইনজীবী সমিতির এক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বৃহস্পতিবারও আদালতের কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো বিচারপ্রার্থী।
নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের আদালত বর্জন কর্মসূচি চলছিল। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার বিকেলে বরিশালের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম (অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট) আদালতের এজলাসে হট্টগোল ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় দ্রুত বিচার আইনে করা মামলায় পরদিন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমানকে (লিংকন) গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
দুপুরে জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, বিচারপ্রার্থীরা নথিপত্র হাতে এজলাসের সামনে ঘুরছেন। সবুজ হাওলাদার নামের এক বিচারপ্রার্থী বলেন, প্রায় তিন মাস আগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে তাঁদের তিনজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। একজন নিম্ন আদালত থেকে জামিনে আছেন। বাকি দুজন উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট) থেকে আগাম জামিন নেন। সেই জামিনের মেয়াদ আজই শেষ হচ্ছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশ ছিল, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নিম্ন আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করতে হবে। কিন্তু টানা তিন দিন আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তিনি আবেদন করতে পারছেন না। সামনে শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় তিনি অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
শুধু সবুজ হাওলাদার নন, জেলা জজ আদালতসহ বরিশালের বিভিন্ন আদালতে প্রতিদিন হাজারো বিচারপ্রার্থী হাজিরা, জামিন ও শুনানির জন্য এসে ফিরে যাচ্ছেন। বাকেরগঞ্জ থেকে আসা বিচারপ্রার্থী আনসার আলী হাওলাদার বলেন, সকাল ৯টা থেকে তিনি আদালতে অপেক্ষা করছেন। তাঁর একটি মামলায় হাজিরা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুপুর পর্যন্ত কোনো কার্যক্রম না চলায় হাজিরা দিতে পারেননি।
এ ঘটনায় গতকাল দুপুরে আদালত চত্বর থেকে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমানকে আটক করার পর আদালতে হট্টগোলের ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় দ্রুত বিচার আইনের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে তাঁকে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক এস এম শরীয়তউল্লাহ তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আইনজীবীদের অভিযোগ, এজলাসে ভাঙচুর, বিচারককে হুমকি ও ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতিসহ ১২ আইনজীবীর বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে। অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজীব মজুমদার গতকাল বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলাটি করেন। ওই দিন বিকেলে সাদিকুর রহমানকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। আজ সকালে বিক্ষুব্ধ আইনজীবীরা তাঁর জামিন ও মুক্তির দাবি জানিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আজকের মধ্যে জামিন না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য আদালতের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হবে।
বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির বিষয়ে আইনজীবীদের ভাষ্য, বিচারপ্রার্থীরা ভোগান্তিতে পড়লেও তাঁদের দাবি-দাওয়া নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি প্রত্যাহারের সুযোগ নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
গত সোমবার দুপুরে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস আদালতে আত্মসমর্পণের পর জামিন পান। অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরীয়তউল্লাহ তাঁর জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজসহ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের আরও তিন নেতা জামিনে মুক্তি পান। এ ঘটনার প্রতিবাদে চিফ মেট্রোপলিটন আদালত ও অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের কার্যক্রম বর্জন করেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। তাঁরা চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন।
পরদিন মঙ্গলবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের এজলাসে ঢুকে হট্টগোল করেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতিসহ কয়েকজন আইনজীবী। তাঁরা এজলাসে ঢুকে বেঞ্চে ধাক্কাধাক্কি ও চিৎকার করার পাশাপাশি কাগজপত্র তছনছ করেন। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

Comments
Comments