[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

নীতিমালা জারি, তবু স্কুলে পুনর্ভর্তি ফি বন্ধ হবে কি?

প্রকাশঃ
অ+ অ-
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)

সন্তান বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো ফল করে নতুন শ্রেণিতে ওঠায় আনন্দিত হলেও ‘পুনর্ভর্তি ফি’র আর্থিক চাপ নিয়ে অনেক অভিভাবকই আতঙ্কে থাকেন। একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা চালিয়ে যেতেও মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হওয়ায় প্রতিবছরই ক্ষোভ প্রকাশ করেন অভিভাবকেরা। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি নতুন নীতিমালা জারি করেছে, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে কোনো প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কোনোভাবেই পুনর্ভর্তি ফি নেওয়া যাবে না।

৯ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে। নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, পুনর্ভর্তি ফি নেওয়া নিষিদ্ধ হলেও ২০২৪ সালের টিউশন ফি নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত বেতন নেওয়া যাবে।

সচিব রেহানা পারভীনের সই করা এই নীতিমালায় টিউশন ফি, ভর্তি ফি, সেশন ফি, এবং বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার ফিসহ প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এই নির্দেশনা কার্যকর হবে।

অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে এবং আদালতে রিট আবেদনের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ কমাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ৯ ফেব্রুয়ারি ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে। নীতিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কোনোভাবেই পুনর্ভর্তি ফি নেওয়া যাবে না। তবে ২০২৪ সালের টিউশন ফি নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত বেতন নেওয়া যাবে।

সরকার এর আগেও একই ধরনের নির্দেশনা দিয়েছিল। গত বছরের ১৯ নভেম্বর সচিব রেহানা পারভীনের সাক্ষর করা বেসরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী ভর্তি নীতিমালায় জানানো হয়েছিল, একই প্রতিষ্ঠানে এক শ্রেণি থেকে অন্য শ্রেণিতে ওঠার ক্ষেত্রে নতুন করে কোনো ভর্তি ফি নেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে শুধু সেশন চার্জ নেওয়া যাবে। তবে বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানই এই নিয়ম মানেনি।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার। আর একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে আরও প্রায় ২২ লাখ ৭৪ হাজার ৪৪৮ জন শিক্ষার্থী। বিশাল সংখ্যক এই শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ওপর বাড়তি এই ফি বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে।  

ফেব্রুয়ারির বেতনের সঙ্গে জেনারেটর ও আইপিএস ফি হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। সব শাখা মিলিয়ে এ বছর ভর্তি হওয়া প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে এ খাতে আদায় হতে পারে এক কোটির বেশি টাকা। অথচ জেনারেটরের সংখ্যা, ব্যবহার বা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের কোনো হিসাব প্রকাশ করা হয় না বলে অভিযোগ তাঁর।

টিপু সুলতান, অভিভাবক

রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাধিক অভিভাবক তাঁদের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ সন্তানের ভর্তির জন্য পুনর্ভর্তি ফি দিয়েছেন। আবার সরাসরি পুনর্ভর্তি ফি না নিলেও ‘উন্নয়ন ফি’, ‘রিলেশন ফি’, ‘স্কাউট ফি’ বা বাড়তি সেশন ফি হিসেবে টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন অনেক অভিভাবক। তবে সন্তানের পড়াশোনার ক্ষতি হতে পারে এমন আশঙ্কায় স্কুলের নাম বললেও নিজের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি অনেকে।

রাজধানীর নামী একটি স্কুলের অভিভাবক টিপু সুলতান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, ফেব্রুয়ারি মাসের বেতনের সাথে জেনারেটর ও আইপিএস ফি হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। সব শাখা মিলিয়ে এ বছর ভর্তি হওয়া প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে শুধু এই খাতেই বছরে এক কোটি টাকার বেশি আদায় হতে পারে। অথচ জেনারেটরের সংখ্যা, ব্যবহার বা রক্ষণাবেক্ষণ খরচের কোনো হিসাব জানানো হয় না।

অন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠানের একজন অভিভাবক বলেন, একই স্কুলের পাশের কক্ষেই নতুন শ্রেণির ক্লাস হবে, তারপরও হাজার হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। সরকার নিষেধ করলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তা মানছে না। আবার সরকারের যেসব প্রতিনিধির বিষয়টি তদারকি করার কথা, তাঁরাও চুপ করে আছেন।

আলী আসগর আকন পেশায় একজন সাংবাদিক। তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে কাজ করেন। তিনি জানান, তাঁর মেয়ে বরিশালের একটি স্কুলে পড়ে। চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তির সময় পুনর্ভর্তি ফিসহ তাঁর প্রায় ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

আলী আসগর প্রশ্ন তোলেন, একবার সন্তান ভর্তি হওয়ার পর প্রতি বছর কেন আবার ভর্তি ফি দিতে হবে? যাঁদের একাধিক সন্তানকে বছরের শুরুতে ভর্তি করতে হচ্ছে, তাঁদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। এই বাড়তি টাকা জোগাড় করতে অভিভাবকদের ঋণ বা ধারদেনা করতে হচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নিয়মবহির্ভূতভাবে বাড়তি ফির বোঝা অভিভাবকদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। অভিভাবকেরাও এক্ষেত্রে নিরুপায়। কারণ তাঁদের কাছে সন্তানই সবচেয়ে বড় সম্পদ, তাই সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য তাঁরা সাধ্যমতো সব চেষ্টা করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অভিভাবক জানান, রাজধানীর একটি স্কুলে তাঁর দুই সন্তানের পুনর্ভর্তি বাবদ ৪১ হাজার ৪০০ টাকা দিতে হয়েছে। এর বাইরে মাসিক বেতন, বই-খাতা ও পোশাকের খরচ তো আছেই। সব মিলিয়ে বছরের শুরুটা এখন বড় এক আতঙ্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

 
একবার বাচ্চা ভর্তি হওয়ার পর প্রতিবছর আবার ভর্তি ফি কেন? যাঁদের একের অধিক সন্তানকে বছরের শুরুতে ভর্তি করতে হচ্ছে তাঁদের অবস্থা করুণ। অভিভাবকদের এ বাড়তি টাকার জন্য ঋণ, ধারদেনা করতে হচ্ছে।
আলী আসগর, অভিভাবক
পুনর্ভর্তি ফি আদায়ের প্রতিবাদে গত ২৫ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ আইন ও অধিকার এইড ফাউন্ডেশন’-এর পক্ষে জনস্বার্থে উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলা করেন ভুক্তভোগী আলী আসগর ও সাংবাদিক রাজু আহমেদ। এই আবেদনে অবৈধভাবে টাকা আদায় বন্ধ করা, এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং এ বছর আদায় করা টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

আলী আসগর জানান, সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, প্রতি বছর একই স্কুলে পুনর্ভর্তি বাবদ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। সরাসরি এই খাতে ফি নেওয়া ছাড়াও প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়ন ফি, রিলেশন বা সম্পর্ক ফি এবং স্কাউট ফিসহ নানা অজুহাতে টাকা নিচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান পুনর্ভর্তি খাতের নাম না লিখে সেশন ফি বাড়িয়ে বাড়তি টাকা আদায় করছে। রাজধানীর উত্তরার একটি প্রতিষ্ঠানে চতুর্থ শ্রেণিতে (ইংরেজি মাধ্যম) ভর্তি ফি ও বেতন ছাড়া শুধু সেশন চার্জই নেওয়া হয়েছে ২০ হাজার টাকা। অভিভাবকেরা এমন শত শত অভিযোগ করেছেন।

বাংলাদেশ আইন ও অধিকার এইড ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক আলী আসগর তাঁর রিট আবেদনে শিক্ষা সচিব ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিবাদী করেছেন। পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে নতুন নীতিমালা জারির কথা জানানো হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন নীতিমালার কপি হাতে পাওয়ার পর ১৮ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতে সংবাদ সম্মেলন করে তা সবার সামনে তুলে ধরে সংগঠনটি। তবে চলতি বছরে যেসব প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে পুনর্ভর্তি ফি নিয়েছে, তা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে নীতিমালায় কিছু বলা হয়নি বলে তিনি জানান।

নতুন নীতিমালায় কোন খাতে ফি নেওয়া যাবে আর কোন খাতে যাবে না এবং নিয়ম ভাঙলে কী শাস্তি হবে—তা স্পষ্ট করা হয়েছে। তবে অভিভাবকদের মনে প্রশ্ন রয়েই গেছে। তাঁদের মতে, আগেও সরকারের পক্ষ থেকে এমন অনেক নির্দেশনা ও নীতিমালা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। তাই এবারের নতুন নীতিমালা আসলেও বাস্তবে কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।

এ ছাড়া এই নীতিমালা ঠিক কবে থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়েও নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমার কথা বলা নেই। অভিভাবকদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়ন ফি নিলেও সেই টাকা কোথায় খরচ হয় তা তাঁরা জানতে পারেন না। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বাড়তি আর্থিক চাপ সত্ত্বেও তাঁরা মুখ বুজে টাকা দিয়ে যাচ্ছেন। এখন তাঁদের প্রত্যাশা, কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও যেন পুনর্ভর্তি ফির এই ভোগান্তি বন্ধ হয়।
Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন