[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

১৫ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকারের ভিডিওগুলোর ভবিষ্যৎ কী?

প্রকাশঃ
অ+ অ-
 মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়

শর্ত পূরণ না হওয়ার কারণ দেখিয়ে একটি প্রকল্পের আওতায় নেওয়া প্রায় ১৫ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার ভিডিও সাক্ষাৎকার বাতিল করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ কাজে যুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো বিল পরিশোধ করা হবে না। পাশাপাশি, নেওয়া সাক্ষাৎকারগুলোর ভিডিওও সংরক্ষণ করা হবে না।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব ভিডিওতে মুক্তিযুদ্ধের ‘সঠিক ইতিহাস’ যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। ভিডিওগুলোতে নানা ধরনের অসংগতি রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের অভিজ্ঞতাও সেখানে ঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। কর্মকর্তাদের মতে, এসব ভিডিও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছালে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। সে কারণেই ভিডিওগুলো বাতিল করা হয়েছে।

শুধু সাক্ষাৎকার নয়, বিগত সরকার আমলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রায় ৫০ কোটি টাকার পুরো প্রকল্পটিও বাতিল করা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া যেসব বীর মুক্তিযোদ্ধা এখনো জীবিত আছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২২ সালে এ প্রকল্প নেওয়া হয়। ‘বীরের কণ্ঠে বীরগাথা’ শিরোনামের এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয় ৪৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।

প্রকল্পটির আওতায় ৮০ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকারভিত্তিক তথ্যচিত্র, ৮০ হাজার ইউটিউব কনটেন্ট (আধেয়) এবং ১৬টি ডকুমেন্টারি তৈরির কথা ছিল। প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর। তবে এর পাঁচ মাস আগেই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ।

নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজটি পায় ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (এমটিআই) নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ২০২৩ সালের ১৬ মে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ প্রতিষ্ঠানের চুক্তি হয়। 

৪৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ের ‘বীরের কণ্ঠে বীরগাথা’ প্রকল্পের আওতায় ৮০ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকারভিত্তিক তথ্যচিত্র, ৮০ হাজার ইউটিউব কনটেন্ট এবং ১৬টি ডকুমেন্টারি তৈরির কথা ছিল।

চুক্তিপত্রে বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় ১৯টি প্রশ্ন করতে হবে। ভিডিওভিত্তিক এসব সাক্ষাৎকারে একজন মুক্তিযোদ্ধা কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন, কার নির্দেশে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস কোথায় ও কীভাবে ছিলেন, সম্মুখযুদ্ধের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল কি না, অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন কি না, যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন কি না—এ ধরনের মোট ১৯টি মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।

প্রকল্প কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা যায়, এ পর্যন্ত ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (এমটিআই) ২৭ হাজার ৪২৮টি ভিডিও চিত্র তৈরি করে জমা দিয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৭৮৮টি ভিডিও বিগত সরকারের সময়ে জমা পড়ে। সেগুলো বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পরে জমা দেওয়া ১৪ হাজার ৬৪০টি ভিডিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাতিল করা হয়। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যেসব ভিডিও বাতিল করা হয়েছে, সেগুলোতে নির্ধারিত এসব মানদণ্ড মানা হয়নি।

‘বীরের কণ্ঠে বীরগাথা’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আফরাজুর রহমান বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের ভিডিও চিত্র তৈরির ক্ষেত্রে যেসব মানদণ্ড অনুসরণ করতে বলা হয়েছিল, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেগুলো মানেনি।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভিডিও চিত্র তৈরি বন্ধ করতে বলা হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি তা মানেনি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ কারণে তাদের বিল পরিশোধ করা হয়নি। প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে।’

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় তিন দিন পর, ৮ আগস্ট। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে ফারুক-ই-আজম বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক ভিডিও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। কমিটির সভাপতি করা হয় মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদকে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, সাক্ষাৎকারের ভিডিওগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের ‘সঠিক ইতিহাস’ তুলে ধরা হয়নি। ভিডিওতে রয়েছে নানা অসংগতি। মুক্তিযোদ্ধাদের অভিজ্ঞতা ভিডিওতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। এসব ভিডিও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গেলে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।

কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় নির্ধারিত কাঠামো অনুসরণ করা হয়নি। কোথাও ভিডিও ও শব্দের মান নির্ধারিত মানদণ্ডে পৌঁছায়নি।

উপদেষ্টা ফারুক–ই–আজমের সভাপতিত্বে ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সভায় এ প্রকল্পের আওতায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সভায় ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি অসমাপ্ত রেখেই শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়ার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১৪ হাজার ৬৪০টি ভিডিও জমা দেয়। সেগুলো যাচাইয়ের জন্য মন্ত্রণালয় একটি সাবকমিটি গঠন করে। ওই কমিটিই ভিডিওগুলো গ্রহণ না করার সুপারিশ করে।

সাবকমিটির এক বৈঠকের কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মনোয়ার ইসলাম বলেন, ধারণ করা ভিডিও চিত্র অত্যন্ত নিম্নমানের। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে পারেনি। এসব ভিডিও আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। এ ছাড়া এসব ভিডিওর বিপরীতে বিল পরিশোধ করলে সরকারি টাকার অপচয় হবে।

কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা বেলায়েত হোসেন সভায় বলেন, ভিডিও চিত্রের বর্ণনাগুলো একঘেয়ে এবং সেখানে সম্মুখযুদ্ধের অভিজ্ঞতা উঠে আসেনি। এ ধরনের কাজের বিপরীতে বিল পরিশোধ করলে সরকারি অর্থের অপচয় হবে। কমিটির আরেক সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা এফ আর চৌধুরী বলেন, ভিডিওগুলো মানসম্মত নয়। প্রকল্পের উদ্দেশ্যের সঙ্গে এসব ভিডিও চিত্রের কোনো মিল নেই।

বাতিল হওয়া সাক্ষাৎকারগুলোর ভবিষ্যৎ কী—এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, এসব ভিডিও ফিল্ম আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হবে না। কারণ, এসব ভিডিও চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক চিত্র উঠে আসেনি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমটিআই এ পর্যন্ত ২৭ হাজার ৪২৮টি ভিডিও চিত্র বানিয়ে জমা দিয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৭৮৮টি বিগত সরকারের সময়ে, সেগুলো বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পরে জমা দেওয়া ১৪ হাজার ৬৪০টি বাতিল হয়েছে।

নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৮০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার ভিডিওভিত্তিক সাক্ষাৎকার নেওয়ার প্রথম ধাপে বিগত সরকার আমলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১২ হাজার ৭৮৮টি সাক্ষাৎকার জমা দেয়। এ কাজের জন্য তিনটি বিলের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়ার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তড়িঘড়ি করে আরও ১৪ হাজার ৬৪০টি ভিডিওভিত্তিক সাক্ষাৎকার জমা দেয়। এসব সাক্ষাৎকারের বিপরীতে তারা ৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বিল পরিশোধের দাবি জানায়। এরপরই ভিডিওগুলো যাচাইয়ের জন্য সাবকমিটি গঠন করা হয়।

আমাদের আগের ১২ হাজার ৭৮৮টি সাক্ষাৎকার যদি মানসম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে পরের ১৪ হাজার ৬৪০টি সাক্ষাৎকার খারাপ হয় কীভাবে?
আজমল কবির রাব্বি, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, এমটিআই

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের (এমটিআই) ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার আজমল কবির রাব্বি বলেন, ভিডিওগুলো বাতিলের সিদ্ধান্ত উদ্দেশ্যমূলক বলে তাঁরা মনে করছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের আগের ১২ হাজার ৭৮৮টি সাক্ষাৎকার যদি মানসম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে পরের ১৪ হাজার ৬৪০টি সাক্ষাৎকার খারাপ হয় কীভাবে? এটি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিহিংসামূলক কাজ।’

মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আজমল কবির বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় যে কথা বলছে, তা মনগড়া। আগের মন্ত্রী (আ ক ম মোজাম্মেল হক) কাজ দেখেই ভিডিও চিত্র গ্রহণ করেছিলেন।’

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন