তড়িঘড়ি করে ‘ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ বিল’ পাস, বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ
অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, বিলটি পাস হয়ে গেলেও পরবর্তী সময়ে বিরোধী দলের সংশোধনী প্রস্তাবগুলো যৌক্তিক হলে তা গ্রহণ করা হবে।
বিলের ওপর কোনো আলোচনা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে ‘ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ বিল’ জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে। বুধবার বিলটি সংসদে তোলার পরপরই তা পাস করা হয়। তড়িঘড়ি করে সংসদে বিল আনা, সেটি পরীক্ষা করার জন্য স্থায়ী কমিটিতে না পাঠানো, সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ না দেওয়া এবং দ্রুততার সঙ্গে পাস করার কঠোর সমালোচনা করেছে বিরোধী দল।
অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, বিলটি পাস হয়ে গেলেও পরবর্তী সময়ে বিরোধী দলের সংশোধনী প্রস্তাবগুলো যৌক্তিক হলে তা গ্রহণ করা হবে। এটি নতুন কোনো আইন নয়। সংসদ অধিবেশন শেষ হচ্ছে, তাই বিলটি পাস করতে হচ্ছে।
পাস হওয়া বিলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বিলুপ্ত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইনও এর মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে।
সংসদ বৈঠকের আজকের নির্ধারিত কার্যসূচিতে আইন তৈরির কোনো বিষয় ছিল না। সম্পূরক কার্যসূচিতে এটি যোগ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল’ সংসদে তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সাধারণত বিল তোলার তিন দিন আগে সংসদ সদস্যদের নোটিশ দিতে হয়। বিল সংসদে তোলার পর সেটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। তবে সেটি না করে বিলটি সরাসরি পাস করার প্রস্তাবও করতে পারেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী।
বিল তোলার আগে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সংসদকে জানান, বিলের নোটিশের সময়ের বিষয়টি তিনি মওকুফ করেছেন।
কোনো স্বার্থ জড়িত কি না, প্রশ্ন নাজিবুর রহমানের
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি সংসদে তোলার প্রস্তাব করলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, ‘এই আইনের মাধ্যমে আগের ছয়টি আইন বাতিল করা হচ্ছে। দুটি প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত করা হচ্ছে।’
স্পিকারের উদ্দেশে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘তাঁরা আজ বিলের কপি পেয়েছেন। তিন দিনের বিষয়টি স্পিকার মওকুফ করেছেন; কিন্তু ৯ জুলাই এই আইনটি মন্ত্রিসভায় পাস হয়েছে। ছয় দিন চলে যাওয়ার পরও সংসদ সদস্যদের নোটিশ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কেন দেওয়া হয়নি? এটি কমিটিতে না পাঠিয়ে সরাসরি পাস করার এত তাড়াহুড়া কেন—এসবের কোনো যৌক্তিকতা তাঁরা পাচ্ছেন না।’
এখানে কোনো স্বার্থ জড়িত কি না, এমন প্রশ্ন রেখে বিলটি স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন নাজিবুর রহমান।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিল সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর বিষয়টি সপ্তম সংসদ থেকে শুরু হয়েছে। যে বিলটি আনা হয়েছে, এটি কোনো নতুন আইন নয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে কাজের মধ্যে এক ধরনের ওভারল্যাপিং বা পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ একই উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল। সেগুলোকে এখন একটি কর্তৃপক্ষের মধ্যে একীভূত করা হচ্ছে।’
আইন পাসে বিরোধী দলের সহযোগিতা চাইলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটি সংসদে আরও আগে আনতে পারলে তাঁরা খুশি হতেন। কিন্তু আজ অধিবেশন শেষ হবে। এই বিলের মধ্যে জটিল কোনো বিষয় থাকলে তিনি নিজেই এটি স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করতেন।’ তিনি আইন পাসে বিরোধী দলের সহযোগিতা চান।
তখন নাজিবুর রহমান ডেপুটি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, ‘কোনো সময় না দিয়ে এভাবে তাড়াহুড়া করে আপনারা যদি বিল পাস করার অনুমতি দেন, তাহলে আমি মনে করি, আইনপ্রণেতা হিসেবে আমাদের যে মৌলিক অধিকার, সেটি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং এটি বারবার হচ্ছে।’
তবে তাঁর আপত্তি নাকচ হয়ে যায়। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি সংসদে তোলার অনুমতি দেওয়া হয়। বিলটি তোলার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তা অবিলম্বে বিবেচনার জন্য প্রস্তাব করেন।
যুক্তিযুক্ত হলে সংশোধনী নেওয়া হবে
তখন এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘কয়েকটি ধারায় তাঁদের সংশোধনী আছে। সেটা কীভাবে দেবেন?’
তখন ডেপুটি স্পিকারের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় সদস্য যেসব ধারায় সংশোধনের কথা বলছেন, এখন বিধি মোতাবেক যেহেতু আপনি সবকিছু মওকুফ করেছেন, তাঁরটাও মওকুফ করে মৌখিকভাবে তা তোলার অনুমতি দিতে পারেন। আমরা নোট করব এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে যদি কোনো সংশোধনী গ্রহণ করার থাকে, তাহলে পরে আমরা তা গ্রহণ করব—যদি সেটা যুক্তিযুক্ত হয়।’
এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজ এই অধিবেশনের শেষ দিন। আমরা চাই যে আমাদের এই দিনটি যেন মর্যাদাপূর্ণ হয়ে থাকুক। প্রথম অধিবেশনে বেশ কিছু আইন খুব তাড়াহুড়া করে পাস করতে হয়েছে সময়ের বাধ্যবাধকতার কারণে। সেই সময় আমরা বলেছিলাম, ভবিষ্যতে যেন সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী আমাদের কাছে আসে। এখানে শুধু অধিকারের প্রশ্ন নয়, এটি দায়িত্বেরও ব্যাপার। আমরা অধিকার না হয় ত্যাগ করলাম; কিন্তু দায়িত্বে আমাদের অবহেলা হয়ে গেল।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘একটা বিষয়কে তাড়াহুড়া করে জায়গা দিতে গিয়ে অনেক অধিকার এবং দায়িত্ব লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং এটি এই সংসদের জন্য ভালো কোনো নজির হবে না।’
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা ঠিকই বলেছেন।’ তিনি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে সদস্যরা যেসব ধারার মধ্যে সংশোধনী আনতে চান, তা নিয়ে এলে যৌক্তিক হলে তা গ্রহণ করা হবে। আগামী অধিবেশনেও সেটা হতে পারে।
তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশে করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মাননীয় মন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, মহান জাতীয় সংসদে আমরা প্রত্যাশা করছি সেই প্রতিশ্রুতি আপনি যৌক্তিকভাবে রক্ষা করবেন।’
পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
বিলে যা আছে
ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ হবে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। একজন চেয়ারম্যান ও সাতজন সদস্য এর দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। চেয়ারম্যান হবেন কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী। চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সরকার নিয়োগ দেবে। কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় হবে ঢাকায়। সরকারের অনুমোদন নিয়ে দেশে বা বিদেশে এর শাখা কার্যালয় ও লিয়াজোঁ অফিস স্থাপন করা যাবে।
How did this article make you feel?
Related Articles
নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগ উপদেষ্টার বিএনপিতে যোগ দেওয়ার ঘোষণা
Jul 03, 2026
1 shared tag
মিঠাপুকুরে মসজিদে জামায়াতের দলীয় সভা, মুসল্লিদের ক্ষোভ
Jun 27, 2026
1 shared tag
প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসাব মেলেনি, ১১ দলীয় জোটে বাড়ছে অসন্তোষ
Jun 08, 2026 · 1 min
1 shared tag
তোফায়েল আহমেদসহ সাবেক মন্ত্রী-এমপি এবং পল্লবীর শিশুর মৃত্যুতে সংসদে শোক
Jun 07, 2026 · 1 min
1 shared tag