জঙ্গি তৎপরতা নেই, উগ্রবাদ নিয়ে উদ্বেগ
অবশ্য সরকার বলছে, দেশে জঙ্গি তৎপরতা নেই, কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর বিচ্ছিন্ন তৎপরতা থাকতে পারে।
দেশে গত কয়েক বছরে জঙ্গিগোষ্ঠীর কোনো হামলা না হলেও জঙ্গিদের অস্তিত্ব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সম্ভাব্য জঙ্গি হামলা ও জঙ্গি সংগঠনগুলোর পুনর্গঠনের চেষ্টার আশঙ্কায় পুলিশ নজরদারি রাখছে। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সাদা পতাকা লাগানোর ঘটনায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলে আলোচনা হয়েছে। পুলিশের সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
অবশ্য সরকার বলছে, দেশে জঙ্গি তৎপরতা নেই, কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর বিচ্ছিন্ন তৎপরতা থাকতে পারে।
দেশে জঙ্গিদের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নৃশংস হামলার ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৬ সালের ১ জুলাই। সেদিন রাতে রাজধানীর গুলশান ২-এর হোলি আর্টিজান বেকারিতে সশস্ত্র হামলা চালায় জঙ্গিরা। দেশি-বিদেশি ২০ জন নারী-পুরুষকে হত্যা করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন ছিলেন ইতালি, জাপান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশের দুই কর্মকর্তাও নিহত হন। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটেছিল নৃশংস ওই হামলার। অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হন। আজ সেই ঘটনার ১০ বছর পূর্ণ হলো।
পুলিশ বলছে, হোলি আর্টিজানে হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক অনেকটাই ভেঙে পড়ে। তবে ভেতরে ভেতরে সংগঠনগুলো পুনর্গঠনের চেষ্টার আশঙ্কায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সংবেদনশীল এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জঙ্গিবাদ-সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলার তিন শতাধিক আসামি জামিনে মুক্তি পান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মুক্তি পাওয়া ওই ব্যক্তিদের একটি অংশ পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালায়। নির্বাচনের পর গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। বড় ধরনের কোনো জঙ্গি তৎপরতা সামনে না এলেও সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। গত এপ্রিলে পুলিশ সদর দপ্তরের এক সতর্কবার্তায় বলা হয়, ‘নিষিদ্ধঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করতে পারে।’
সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে পুলিশ সদর দপ্তরে মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের সভাপতিত্বে ক্রাইম কনফারেন্সেও জঙ্গিবাদ বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় জঙ্গি সংগঠনের নামে সাদা পতাকা মিছিল কোনোভাবেই সহ্য না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার এবং জঙ্গি সংগঠনগুলোর ওপর নজরদারি আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ধারাবাহিক অভিযানে জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো অনেকটাই ভেঙে দেওয়া সম্ভব হলেও নেটওয়ার্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি বলে মনে করছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। ওই ইউনিটের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গত দুই মাসে একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত অন্তত পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনার অভিযোগ রয়েছে।
অবশ্য সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই। ‘জঙ্গি’ শব্দটিকে তিনি স্বীকৃতি দেন না। তবে কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠী রয়েছে, যা প্রায় সব দেশে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী আমলে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এসব গোষ্ঠীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে বাংলাদেশে সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই।’
এদিকে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক ও মুখপাত্র এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় উগ্রবাদী তৎপরতার আলামত পাওয়া গেছে। কোথাও এ ধরনের কর্মকাণ্ডের তথ্য-প্রমাণ মিললে র্যাব তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। উগ্রবাদসহ যেকোনো ধরনের নাশকতামূলক তৎপরতা প্রতিরোধে বাহিনী সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
হোলি আর্টিজানে হামলা মামলার রায়ে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ‘নব্য জেএমবি’র সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের করা আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি গত বছরের ১৭ জুন প্রকাশিত হয়। এরপর আসামিরা আপিল বিভাগে আবেদন করেন। বর্তমানে মামলাটি আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আমরা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে থাকি। এ মামলার ক্ষেত্রেও আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ঘাটতি থাকবে না।’
গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়িটিতে ছিল হোলি আর্টিজান বেকারি। রেস্তোরাঁটি আর নেই। বাড়িটিতে বসবাস করছেন বাড়ির মালিকের পরিবার। ওই বাড়ির মালিক সামিরা আহমেদ, তাঁর স্বামী সাদাত মেহেদী ও তাঁদের সন্তান সেখানে যাতায়াত করেন।
গতকাল মঙ্গলবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির ভেতর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, চারদিকে গাছপালা। ছিমছাম, নীরব। বাড়িটির পাশের লেক ভিউ ক্লিনিকের এক নিরাপত্তাকর্মী জানান, হোলি আর্টিজান হামলার বার্ষিকী উপলক্ষে আজ বুধবার বাড়িটি সীমিত সময়ের জন্য খোলা হবে। পুলিশ ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের আসার প্রস্তুতিও চলছে। সাধারণ মানুষকে সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় his না। এখনকার অনেকে ১০ বছর আগের ওই ঘটনার কথা জানেন না।
হোলি আর্টিজানে হামলার কিছুদিন পর গুলশান-২ নম্বর চত্বরের পাশে ১৫০/৩ নম্বরে নতুন করে চালু হয়েছিল হোলি বেকারি। তবে তৎকালীন সরকার এক বছরের বেশি ওই নামে রেস্তোরাঁ চালানোর অনুমতি দেয়নি। পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ওরো বেকারি। সেই নামেই চলছে এখনো।
গতকাল বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, রেস্তোরাঁটিতে দেশি-বিদেশি অনেকে বসে খাবার খাচ্ছেন। আবার অনেকে পার্সেল নিচ্ছেন। রেস্তোরাঁটির ম্যানেজার আবু সাঈদ বলেন, ৭৯ নম্বর সড়কে থাকা হোলি আর্টিজান রেস্তোরাঁতেও তিনি চাকরি করেছেন। ওই রাতের বিভীষিকা নিজের চোখে দেখেছেন। বললেন, ‘সেদিন আমিও মারা যেতে পারতাম।’
আবু সাঈদ বলেন, নাম এখন ওরো বেকারি হলেও পুরোনো অনেক ক্রেতা এখনো ‘হোলি আর্টিজান’ নামেই চেনেন। নতুনেরা অবশ্য ওরো বেকারি নামেই ডাকেন। ১০ বছর আগের ঘটনাটি অনেকে ভুলে গেছেন।
How did this article make you feel?
Related Articles
হোলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর
Jul 01, 2026
4 shared tags
ঈশ্বরদীতে শিক্ষকের বিদায় অনুষ্ঠান ভাঙচুর করে পণ্ড করল বিএনপির এক পক্ষ
Jun 30, 2026 · 1 min
1 shared tag
খাবার দিতে দেরি হওয়ায় রাজশাহীতে দুটি রেস্তোরাঁয় ভাঙচুর, হাতবোমা বিস্ফোরণে পুলিশ আহত
Jun 20, 2026 · 1 min
1 shared tag
পুঠিয়ায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বাড়িঘর ভাঙচুর-লুটপাট, ৬ দিন পর মামলা নিল পুলিশ
Jun 18, 2026 · 1 min
1 shared tag