ফলন ভালো হলেও দাম কম, ঢলন-খাজনার চাপে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষিরা
চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ বছর আমের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। গাছে গাছে ঝুলছে আম। ভালো উৎপাদনের কারণে লাভের আশায় ছিলেন চাষিরা। কিন্তু বাজারে কম দাম, ঢলন প্রথা এবং খাজনার বাড়তি চাপ তাঁদের সেই আশা অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। এতে আমচাষিদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
চাষিদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় অনেক জাতের আমের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর সঙ্গে প্রতি মণে অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত আম দিতে হচ্ছে ঢলন হিসেবে। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা।
তবে প্রশাসনের দাবি, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢলন প্রথা বিলুপ্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে আড়তদারদের ভাষ্য, চাষিদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতেই ঢলন নিয়ে আম কেনাবেচা হচ্ছে। যদিও চাষিদের অভিযোগ, তাঁদের বাধ্য করেই এই অতিরিক্ত আম নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের সবচেয়ে বড় আমের বাজার হিসেবে পরিচিত কানসাটে এখন আমের ব্যাপক সরবরাহ রয়েছে। শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ নয়, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও নওগাঁর সাপাহারসহ বিভিন্ন এলাকা থেকেও আম আসছে এই বাজারে। ফলে বাজারে আমের জোগান বেড়ে গেছে।
কানসাট বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে গোপালভোগ, লক্ষণভোগ, ক্ষীরসাপাত, ল্যাংড়া, আম্রপালি, ব্যানানা, বারি-৪, সূর্যমুখীসহ বিভিন্ন জাতের আম বিক্রি হচ্ছে। গোপালভোগ প্রতি মণ ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা, লক্ষণভোগ ৬৫০ থেকে ৮৫০ টাকা, ক্ষীরসাপাত ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা, আম্রপালি ও ল্যাংড়া ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, ব্যানানা ২ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা এবং রানীপ্রসাদ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চককীর্তি এলাকার আমচাষি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এ বছর ফলন ভালো হলেও অতিরিক্ত গরমের কারণে বাজারে আমের চাহিদা কিছুটা কমেছে। গত কয়েক বছর ধরে ঢলনসহ নানা সমস্যার কারণে তাঁরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
কানসাটের আম বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, একসময় ৪৩ কেজিতে মণ ধরে আম কেনাবেচা হতো। কিন্তু গত এক দশকে ধীরে ধীরে ঢলনের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে এখন অনেক ক্ষেত্রে ৬০ কেজিতে এক মণ হিসেবে আম বিক্রি করতে হচ্ছে।
আড়তদার মেহেরুল ইসলাম বলেন, ওজনসংক্রান্ত বিরোধ দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের উদ্যোগে ৪০ কেজিতে মণ বা কেজি দরে আম বিক্রির সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। তাঁর মতে, সারা দেশে একক ওজননীতি চালু করা হলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
এদিকে খাজনা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে ব্যবসায়ী ও চাষিদের মধ্যে। ব্যবসায়ী রায়হান আলীর অভিযোগ, বাজারের ইজারা মূল্য কমলেও এবার ২৫ শতাংশ বেশি খাজনা নেওয়া হচ্ছে। এমনকি কুরিয়ার সেবার মাধ্যমে আম পাঠানোর ক্ষেত্রেও খাজনা দিতে হচ্ছে।
কানসাট আম আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক টিপুর দাবি, চাষি আম বিক্রির সময় একবার, আড়তে একবার এবং কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠানোর সময় আরও একবার খাজনা দিতে হচ্ছে। এমনকি ঢাকায় পাঠানোর জন্য খালি ক্যারেট আনলেও খাজনা নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কানসাট আম বাজারের ইজারাদার মো. আলমগীর জুয়েল। তিনি বলেন, বাজারে যানজট নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকেরা কাজ করছেন। অতিরিক্ত খাজনা আদায় বা একাধিকবার খাজনা নেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। কেউ এমন ঘটনার শিকার হলে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করার আহ্বান জানান তিনি।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম বলেন, সরকার নির্ধারিত হারে খাজনা আদায় করা হচ্ছে। কুরিয়ারের সামনে বা একাধিকবার খাজনা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে ইজারাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ঢলন প্রথা বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর রয়েছে বলেও তিনি জানান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর আমের ফলন ভালো হয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, আম রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়ানো গেলে কৃষকেরা আরও ভালো দাম পাবেন এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে।
How did this article make you feel?
Related Articles
বউভোলানী, জামাই খুশিসহ ১৮৩ জাতের আম নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মেলা
Jun 19, 2026 · 1 min
3 shared tags
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ৭ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা, ঠেকাল বিজিবি
Jul 24, 2026
2 shared tags
রাবি শিক্ষার্থীকে মারধর: অবরোধে সারা দেশের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ
Jul 21, 2026
2 shared tags
চাঁপাইনবাবগঞ্জে মুচলেকার পরদিনই গোপনে বাল্যবিবাহ
Jul 18, 2026
2 shared tags