সংস্কার প্রশ্নে বিএনপি: বিভক্ত অবস্থানে নেতা-কর্মীরা
![]() |
| জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের শেষ দিনের আলোচনা। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে | ফাইল ছবি |
জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংস্কার কাজ এগিয়ে নেওয়া, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা জরুরি কয়েকটি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ এবং সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে এখন রাজনৈতিক আলোচনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে বিএনপির ভূমিকা। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার কারণে সংস্কারের প্রায় সব সিদ্ধান্তই দলটির সমর্থনের ওপর নির্ভর করছে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন ভিন্ন মত দেখা দিয়েছে; কেউ দলটির কড়া সমালোচনা করছেন, কেউ সতর্ক করছেন, আবার কেউ আরও কিছুদিন অপেক্ষা করে পরিস্থিতি দেখতে চান।
সংসদে থাকা প্রধান দলগুলোর বাইরে অন্য দলগুলোর অনেকেই সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের কারও মতে, বিএনপির বর্তমান অবস্থান দেশকে সেই আগের মতো সংবিধানের দোহাই দিয়ে একনায়কতন্ত্রের দিকেই ফিরিয়ে নেবে। এই অংশের দাবি, রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার নিয়ে বিএনপি আগে যা বলেছিল, এখনকার অবস্থানের সঙ্গে তার মিল নেই। কেউ কেউ বিএনপির এই অবস্থানকে জনস্বার্থবিরোধী বলেও মন্তব্য করেছেন। তবে অন্য একটি অংশ এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য না করে সরকারের ভূমিকা ও পরিস্থিতি আরও পর্যবেক্ষণ করতে চায়।
জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ নিয়ে বিএনপির প্রশ্ন তোলার বিষয়টি পুরো প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিত করে তুলেছে বলে মনে করছেন সংসদের বাইরে থাকা বিভিন্ন দলের নেতারা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি করা মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন না করা এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও আলাদা সচিবালয় তৈরির অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ নিয়েও তাঁরা সমালোচনা করছেন।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। সংবিধান অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকে (১২ মার্চ) অধ্যাদেশগুলো তুলে ধরা হয়। ১০ এপ্রিলের মধ্যে কোনো অধ্যাদেশ সংসদ অনুমোদন না করলে সেটির কার্যকারিতা থাকবে না। অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি ১১৭টি অনুমোদনের সুপারিশ করেছে। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি বাতিল করা এবং ১৬টি এখনই সংসদে বিল হিসেবে না তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই ১৬টি অধ্যাদেশ পরে যাচাই-বাছাই করে আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল হিসেবে আনার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এই ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো রয়েছে।
বিভিন্ন দলের নেতারা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সেটি ঘিরেই জাতীয় বিভিন্ন সংস্কার কমিশন এবং পরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সেখানে আলোচনার মাধ্যমে তৈরি করা জুলাই জাতীয় সনদে অনেক দল সইও করেছে। এত আলোচনার প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশে যাতে আর শেখ হাসিনা সরকারের মতো একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি হতে না পারে। কিন্তু বিএনপি যে অবস্থান নিচ্ছে, তাতে সংস্কারের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সংস্কার কাজ অনিশ্চিত হয়ে পড়লে পুরো বিষয়টি আগের অবস্থাতেই ফিরে যাবে।
জনমতের চাপে বিএনপি লোকদেখানো কিছু সংস্কার করবে—এমনটাই মনে করেন কোনো কোনো দলের নেতারা। তবে তাতে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসবে বলে তাঁরা মনে করেন না।
হাসনাত কাইয়ূম বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বিএনপি গণভোটের পক্ষে যে অবস্থান নিয়েছিল, নির্বাচনের পর সংসদে শপথ নেওয়ার দিনে তারা সেখান থেকে সরে গেল। প্রতিদিনই তারা পেছনে সরে যাচ্ছে। বিএনপি যেহেতু হামলা, মামলা ও নির্যাতনের মুখে দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এসেছে, তাই আমরা আশা করতে চাই যে তারা এই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসবে।’
বিএনপি ঘুরেফিরে একদলীয় শাসনের দিকেই যাচ্ছে বলে মনে করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক এই নেতা বলেন, বিএনপি গণভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার চালাচ্ছে। যদি শেষ পর্যন্ত বিএনপি প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তাহলে জোরদার আন্দোলন ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।
বর্তমান সংসদে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দুজন সংসদ সদস্য আছেন। দলটির প্রধান মাওলানা মামুনুল হক অল্প ভোটে হেরে যাওয়ায় সংসদে যেতে পারেননি। তিনি ঢাকায় দলের এক বৈঠকে বলেন, বিএনপি সংবিধান সংস্কার চায় না, বরং কিছু পরিবর্তন এনে আরও ভয়ংকর স্বৈরাচারী রূপে আত্মপ্রকাশ করতে চায়।
বিএনপি জোটের শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক গত শুক্রবার ঢাকায় দলের এক সভায় বলেছেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি গণভোটের পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার চালিয়েছে। তাই গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা আছে। গণভোটের রায় বাতিল করা সঠিক কাজ হবে না।
আমরা মনে করি, যেসব মৌলিক সংস্কারে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো হতে হবে। সেগুলো বিএনপি করবে বলে আমরা মনে করি। আশা রাখি, বর্তমান সংসদেই সেটি হবে।
—গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে এসে গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নিয়েছিল চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। বর্তমান সংসদে তাদের একজন সদস্য রয়েছেন।
নির্বাচনের পর থেকেই সংস্কারের পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে নিয়মিত বক্তব্য ও বিবৃতি দিচ্ছে ইসলামী আন্দোলন। দলটির যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে বিএনপি যে পথে এগোচ্ছে, তা সঠিক নয়। জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে একমত হওয়া হয়েছিল, তার অনেক কিছু থেকেই তারা সরে যাচ্ছে।
ইসলামী আন্দোলন সরকারকে বারবার সতর্ক করছে জানিয়ে গাজী আতাউর রহমান আরও বলেন, তাঁরা এখনই সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথের কর্মসূচিতে যেতে চান না; বরং আরও কিছুদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে চান।
বিএনপি জোটের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে গণসংহতি আন্দোলন। দলটির সদ্য সাবেক প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি নির্বাচনে জিতে মন্ত্রিসভায়ও স্থান পেয়েছেন। দলটি বিশ্বাস করে, বিএনপি শেষ পর্যন্ত সংস্কার করবে।
গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল বলেন, ‘আমরা মনে করি, জুলাই জাতীয় সনদে যেসব মৌলিক সংস্কারের বিষয়ে সবাই একমত হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন। বিএনপি সেগুলো করবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি। আশা করছি, বর্তমান সংসদেই এই সংস্কারগুলো হবে।’
মৌলিক সংস্কারের পক্ষে থাকলেও তা নিয়ে জামায়াত বা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো ‘তাড়াহুড়া নেই’ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। তিনি বলেন, সংসদ অধিবেশন শেষ হওয়ার পর বোঝা যাবে বিএনপি আসলে কী করতে চায়। সিপিবি আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে চায়।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, ‘গত ৫৪ বছর ধরে দেশ যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য কতগুলো মৌলিক সংস্কার খুবই জরুরি। বিএনপি যদি এসব সংস্কার না করে, তবে তারা জনস্বার্থবিরোধী দল হিসেবে চিহ্নিত হবে।’
একই দিন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়ায় বিএনপি কোনো কিছুকে তোয়াক্কা করছে না। গণভোটের গণরায়কে তারা মানছে না, নতুন নতুন অজুহাত দিচ্ছে এবং নানা ধরনের প্রস্তাবনা আনছে।
জাতীয় সংসদে আগামীকাল সোমবার থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো অনুমোদনের কাজ শুরু হবে। যেসব অধ্যাদেশ অনুমোদন করা হচ্ছে, সেগুলোর পাশাপাশি যে চারটি বাতিল করা হবে, সেগুলোও বিল হিসেবে পেশ করা হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা বিল উত্থাপনের পর বিরোধী দলের সদস্যরা সংশোধনী প্রস্তাব দিয়ে আলোচনার সুযোগ পাবেন। তবে তাঁদের প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে কি না, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে সরকারের ইচ্ছার ওপর। কারণ, সংসদে যেকোনো আইন এমনকি সংবিধান সংশোধন করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ক্ষমতাসীন দল বিএনপির রয়েছে।
এদিকে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে ‘সংসদে প্রতিকার না পেয়ে’ রাজপথে কর্মসূচি পালন করেছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১টি দল। তারা শনিবার ঢাকায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সমাবেশে জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেন, বিএনপি আওয়ামী লীগের মতো স্বৈরাচারী কায়দায় এক ব্যক্তির হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চায়।
সব মিলিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ—এই তিন প্রশ্ন এখন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মূলত বিএনপির হাতেই। ফলে সংস্কার বাস্তবায়নের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টি এখন বিএনপির দিকেই।
একই দিনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়ায় বিএনপি কোনো কিছুকেই পাত্তা দিচ্ছে না। তারা গণভোটের রায় মানছে না এবং নতুন নতুন অজুহাত ও প্রস্তাব সামনে আনছে।
তবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল হবিগঞ্জে এক সমাবেশে বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘যাঁরা বলছেন যে বিএনপি সংস্কার চায় না বা করতে চায় না, তাঁরা সত্য গোপন করছেন। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমরা শুধু সংস্কার চাই-ই না, আমরা তা বাস্তবায়নও করব।’
সব মিলিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ—এই তিনটি প্রশ্ন এখন এক জায়গায় এসে মিলেছে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মূলত বিএনপির হাতেই। ফলে সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টি এখন বিএনপির দিকে।

Comments
Comments