কক্সবাজারে হামের টিকা পাচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার শিশু
![]() |
| কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এক শিশুকে টিকা দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় হাম, রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
কক্সবাজারের মহেশখালী ও রামু উপজেলায় শিশুদের হাম-রুবেলা প্রতিরোধে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। রোববার বেলা ১১টার দিকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
উদ্বোধনী বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৬ সালের মধ্যে দেশ থেকে হাম নির্মূলের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। প্রথম ধাপে দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জেলা ও শহরাঞ্চলেও এটি বাস্তবায়ন করা হবে। কক্সবাজারের দ্বীপাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় হামের লক্ষণ বেশি দেখা যাচ্ছে। এসব এলাকায় কোনো শিশু যেন টিকা থেকে বাদ না পড়ে, সে বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। মহেশখালী ও রামু উপজেলায় ৫ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হবে।
টিকা নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে সচেতনতা বাড়াতে হবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে মসজিদ, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়াতে হবে। হামের লক্ষণ নিয়ে আর কোনো শিশুর মৃত্যু আমরা দেখতে চাই না। ২৫০ শয্যার কক্সবাজার সদর হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় শিশু ওয়ার্ডের ১০ শয্যার হাম ইউনিট ইউনিসেফের সহায়তায় ২০ শয্যায় উন্নীত করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মো. আ মান্নান, ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন মহিউদ্দিন আলমগীর, কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মং টিন ঞ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে একটি শিশুকে টিকা দিয়ে কর্মসূচির সূচনা করা হয়।
মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সোনাদিয়ায় দেড় শতাধিক পরিবার বাস করে। নৌপথে চ্যানেল পার হয়ে এসব বাসিন্দাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা কক্সবাজার সদরে যেতে হয়। এখানকার অধিকাংশ পরিবারের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উপায় সাগরে মাছ ধরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্গম এলাকা হওয়ায় স্বাস্থ্যকর্মীরা সোনাদিয়ায় যেতে আগ্রহী নন। একই অবস্থা উপজেলার কুতুবজোম, মাতারবাড়ী, ছোট মহেশখালী ও শামলাপুর ইউনিয়নেও। এসব এলাকায় নিয়মিত টিকা না পাওয়ায় শিশুরা ঝুঁকিতে রয়েছে।
দ্বীপের পরিবেশকর্মী গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘প্রায় প্রতিটি পরিবারেই সর্দি-কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত শিশু রয়েছে। গত দেড়-দুই বছরে এখানে হামের টিকা দেওয়া হয়নি।’
মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মুহাম্মদ মাহফুজুল হক বলেন, উপকূলীয় এলাকায় টিকা নিয়ে নানা অপপ্রচার ও কুসংস্কার রয়েছে। এ কারণে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি ঠিকমতো চালানো যায়নি। উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ছয়টি ইউনিয়নে প্রায় ৪০ হাজার শিশুকে জরুরি ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হবে। হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য হাসপাতালে ১০ শয্যার একটি বিশেষ ইউনিটও চালু করা হয়েছে।
রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবু জাফর মো. সেলিম বলেন, জোয়ারিয়ানালা, মিঠাছড়ি ও গর্জননিয়াসহ দুর্গম পাহাড়ি ইউনিয়নে অন্তত ৪০ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হবে।
২৫০ শয্যার কক্সবাজার সদর হাসপাতালের ৪০ শয্যার শিশু বিভাগে বর্তমানে ১৩৮ শিশু ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে ৮ শয্যার হাম ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছে ৪২ জন। জায়গার অভাবে এক শয্যায় তিন থেকে চারজন করে শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত দুই দিনে হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের সবার বয়স এক বছরের কম। হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহিদুল আলম বলেন, মৃত শিশুদের হাম ছাড়াও নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া ছিল।
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ মো. শাহজাহান নাজির বলেন, ‘যেসব এলাকায় টিকার আওতা ৮৫ শতাংশের নিচে থাকে, সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে একটি এলাকায় প্রায় ৯০ শতাংশ শিশু সংক্রমিত হতে পারে।’
ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন মহিউদ্দিন আলমগীর বলেন, জেলার ৯টি উপজেলায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৪ লাখ ৫ হাজার শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হবে। প্রথম ধাপে মহেশখালী ও রামুতে ১ লাখ ২০ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হচ্ছে। পরে এসব শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে আলাদা হাম ইউনিট চালু করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত তিন শতাধিক শিশু ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। হামের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে পাঁচ শিশু।

Comments
Comments